২০১৪ সালের ৮ জুলাই থেকে বিশ্ববাসী ইসরাইলের গাজা আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেছে। ২০০৮ সাল থেকে এ নিয়ে তিন বার গাজায় হামলা চালালো দখলদার এ দেশটি। ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ ভূখণ্ডে আনুমানিক ২০ লাখ মানুষের বাস। বলা চলে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ স্থান হলো গাজা। কিন্তু এই যুদ্ধে গাজা কিংবা ইসরাইলের জন্য কী অর্জিত হয়েছে বা কী ক্ষতি হয়েছে তাদের, চলুন সে বিষয়টা বিশ্লেষণ করা যাক।

এই যুদ্ধে গাজার অধিবাসীদের জন্য কিংবা প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য ইতিবাচক এবং নেতিবাচক সব ধরনের প্রাপ্তিই ছিল,একইভাবে ছিল ইসরাইলের জন্যও। ইসরাইল গত ৬ বছরে তিনবার গাজায় হামলা করেছে। প্রথম হামলাটি চালিয়েছিল ২০০৮ সালে। এই আগ্রাসন ২২ দিন পর্যন্ত চলেছিল। দ্বিতীয় হামলাটি সংঘটিত হয়েছিল ২০১২ সালে। আট দিনব্যাপী চলেছিল এই আগ্রাসন। তৃতীয় হামলাটি ইসরাইল চলতি বছরেই চালায় যার রেশ এখনো কাটেনি। এই হামলাটি চলে ৫১ দিন ধরে। এইসব হামলা অধিকৃত ফিলিস্তিনের জনগণসহ তাদের নেতাদের জন্য মারাত্মক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যাগুলো এমনভাবে জটলা পাকিয়েছে যে নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার ওপর এগুলো ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে যার ফলে রাজনৈতিক সংকট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

গেল কয়েক বছরে অধিকৃত ফিলিস্তেনে বিভিন্ন রূপে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয় এবং এই নিরাপত্তাহীনতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এর অন্যতম কারণ হলো ইহুদিবাদী ইসরাইলের কর্মকর্তাদের যুদ্ধকামী তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া। গাজার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ৫১ দিনের আগ্রাসনও ইসরাইলের অভ্যন্তরে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবার আরেকটি বড়ো কারণ। ইসরাইলি দৈনিক ‘ইয়াদিউত অহরুনুত’ ৫১ দিনের যুদ্ধের ওপর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, অন্তত ১০ হাজার লোক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে এবং তাদের শতকরা আশি ভাগই এখন ভয়ে ত্রাসে টানেল থেকে তাদের বাসায় ফিরতে রাজি নয়। এমনকি এই ভীত জনগোষ্ঠী তাদের কর্মকর্তাদের অর্থাৎ তেলআবিব সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের কথায় আস্থা কিংবা বিশ্বাস কোনোটাই রাখে না। নিঃসন্দেহে প্রকৃত নিরাপত্তাহীনতার চেয়ে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি অনেক বেশি খারাপ।

অধিৃকত ভূখণ্ডের জনগণের মাঝে দুটি দল রয়েছে সুস্পষ্টভাবে। একটি দল হলো ইসরাইলি ইহুদি জনগণকে নিয়ে গঠিত। অপর একটি হলো অধিকৃত ভূখণ্ডে বসবাসকারী আরব জনগোষ্ঠী। এই দুই দলের লোকেরাই বিভিন্ন কারণে ৫১ দিনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। অধিকৃত ভূখণ্ডের আরবরা গাজার আরবদের সমর্থনে এবং ইহুদিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকামীদের সমর্থনে বিক্ষোভ করেছে। অপরদিকে ইহুদি অধিবাসীরাও যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতা এবং তাদের জীবনের ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিক্ষোভ করেছে। দুই গ্রুপেরই বিক্ষোভের লক্ষ্য অভিন্ন, সেটা হলো অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইহুদিরাও গাজা যুদ্ধের ঘটনায় ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে।

৫১ দিনের যুদ্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস প্রথমবারের মতো ইসরাইলের বিরুদ্ধে আর-১৩০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এগুলোর ১৩০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। বেনগুরিয়ন এয়ারপোর্ট, দিমুনা পাওয়ার প্লান্টের আশপাশে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বাসভবনের কাছে এমনকি ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের কাছেও এই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। একদিকে হামাসের রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র অপরদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অকার্যকারিতা উভয় দিক বিবেচনা করলেই ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকারী দলগুলো ইসরাইলের অভ্যন্তরে অন্তত ৩,২৪৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। এর মধ্যে ইসরাইলের গর্ব আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা সিস্টেম মাত্র ৫৫৮ টি রকেট ধ্বংস করতে পেরেছে। ৫১ দিনের যুদ্ধে তেলআবিবে নিক্ষেপ করা হয়েছে ১১২টি ক্ষেপণাস্ত্র। আয়রন ডোম মাত্র ৬০টি ধ্বংস করতে পেরেছে। দখলদার ইসরাইল হামাসের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে যার মূল্য পঁয়ত্রিশ কোটি ডলার। ২০১২ সালে আয়রন ডোমে কার্যকারিতা ছিল শতকরা ত্রিশ ভাগ। ২০১৪ সালের যুদ্ধে এতো বেশি ব্যয় করার পরও আয়রন ডোমের কার্যক্ষমতা ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। আয়রন ডোমের ব্যর্থতা এতো প্রকাশ্য ছিল যে এর উন্নয়নের জন্য তথা ইসরাইলের প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ২২ কোটি ডলার ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছে।

অপরদিকে ২০১৪ সালের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইসরাইলের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইসরাইল সরকারের ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ ছিল ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। সেটা এখন বেড়ে ৮৩০ কোটি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই যুদ্ধে ইসরাইলের ক্ষতির পরিমাণ বলা হয়েছে ৬০০ কোটি ডলার। ইসরাইলের অর্থনীতির ৭০ শতাংশই আক্রান্ত হয়েছিল এই যুদ্ধে, কেননা ৫০ লাখ ইসরাইলি হামাসের পাল্টা হামলার আওতায় ছিল। এসব কারণে ইহুদিবাদী ইসরাইল ২০১৫ সালের জেনারেল বাজেটের পরিমাণ দুই শতাংশ কমিয়ে আনতে বাধ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরাইলে ইহুদিবাদীদের প্রকল্পের প্রধান দুটি লক্ষ্য হলো: ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের ইসরাইলে নিয়ে আসা। গত কয়েক বছরে অন্তত ১০ লাখ ইহুদিকে আর্থিক সুবিধা ও নিরাপত্তার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে এসেছে তারা। কিন্তু এবারের যুদ্ধে তাদের সেই লক্ষ্য ভেস্তে গেছে।

ইহুদিরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে জার্মানি এবং আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ফিরে যেতে শুরু করেছে। আর ইহুদিরা যদি ইসরাইল থেকে চলে যায় তাহলে এই অবৈধ রাষ্ট্রটি গড়ে তোলার কোনো অর্থই থাকলো না। গত দুই দশকে দশ লাখেরও বেশি ইহুদি ইসরাইল ছেড়ে চলে গেছে। এর ফলে ইসরাইলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের জনসংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যাবে যা ইসরাইলের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হবে।

ইসরাইলের চ্যানেল-টু টেলিভিশন যুদ্ধের ১০ দিন পরে এক জনমত জরিপ চালিয়েছিল। তাতে দেখা গেছে ইসরাইলের শিক্ষিত যুবকরা ইসরাইল ত্যাগ করার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। তারা উপযুক্ত পরিবেশ ও সময়ের অপেক্ষায় আছে। ইসরাইলে বসবাসকারীদের শতকরা চল্লিশ ভাগ ইহুদিরই জন্ম হয়েছে বাইরের কোনো দেশে। ইসরাইলে তাদের অবস্থানটা তাই একেবারেই কৃত্রিম। এ কারণেও তাদের ইসরাইল ত্যাগের ঘটনা ত্বরান্বিত হয়েছে। আর ইহুদিরা ইসরাইল ছেড়ে চলে যাবার কারণে সেখানে বসবাসরত আরবদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।

ইসরাইলের আরবরা ‘আরব’ হিসেবেই পরিচিত এবং তারা আরবি ভাষায় কথা বলেন। অদূর ভবিষ্যতে তাই ইসরাইলের আরব এবং ইহুদিদের মাঝে পরিচয়গত দিক থেকে ফাটল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৫১ দিনের যুদ্ধের আরেকটা দিক হলো স্থায়ী যুদ্ধ বিরতিটা ছিল ইসরাইলের পক্ষে সুস্পষ্ট ব্যর্থতা। সূত্র: আইআরআইবি

এসএমএ