কিউবা বিপ্লব আর বর্তমানের কিউবা যার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তিনি ফিদেল কাস্ট্রো। আর সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো এই পুরুষের সঙ্গে যার নামটি জড়িয়ে রয়েছে সে চে.. আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।
চে’র সঙ্গে ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে পরিচয় হয় কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর। ক্যাস্ত্রো তখন তৎকালীন বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত গেরিলা দলের নেতৃত্বে ছিলেন। ফিদেলের আহ্বানে সেই গেরিলা দলে চে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। আর্জেন্টিয়ায় জন্ম চে গুয়েভারা ছিলেন তখন ফিদেলের দলে থাকা একমাত্র বিদেশি গেরিলা।
জহুরী যেমন রত্ন চেনে, ফিদেল সেদিন চিনেছিলেন চে গুয়েভারাকে। ছোটভাই রাউলের বন্ধু হলেও অল্পদিনেই দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক বেশ গাঢ় হয়। শুধু তাই নয়, নিজের ব্যক্তিত্ব আর নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে চিকিৎসক থেকে অল্পদিনের মধ্যেই দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায় চে গুয়েভারাকে। ফিদেল কাস্ট্রো যেখানে চে গুয়েভারাও সেখানে।
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে কিউবার বিপ্লব সফল হয়। ৫ বছর ৫ মাস ৬ দিনের সংগ্রামের পর ১৯৫৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ট্রো। এরপর তিনি সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর নজর দেন। তার সহযোগী চে গুয়েভারা কিউবার কূটনীতিক হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করতে থাকেন। শুধু তাই নয়, ফিদেলের বিশ্বস্ত বন্ধু চে গুয়েভারা কিউবার নতুন সরকারে একাধিক ভূমিকা পালন করেন।
যদিও রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক আর রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে দু’বন্ধুর সম্পর্কে কিছুটা ফাটল ধরে। তাছাড়া চে’র বিপ্লবী মন পড়েছিল শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতি। আর তাই তো, ১৯৬৫ সালের ১ এপ্রিল কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও শিল্পমন্ত্রীসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ ত্যাগ করেন চে গুয়েভারা। ত্যাগ করেন ১৯৫৯ সালে দেয়া নাগরিকত্বও। কিউবা ছেড়ে তিনি পাড়ি জমান বলিভিয়ায়। সেখানকার শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে আর্নেস্তো চে আবারও নামের বিপ্লবের পথে।
যাবার আগে চে দীর্ঘদিনের সহচর ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে লেখেন : “অনেক পুরোনো কথা এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে, যখন তোমার সঙ্গে মারিয়া এন্টোনিয়ার বাড়িতে আমার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেদিন তুমি বিপ্লবে অংশ নিতে আমাকে বলেছিলে এবং খুব উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম। আর তখন একটা প্রশ্ন উঠেছিল মৃত্যুকে বরণ করবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর নিজেরাই পেয়েছিলাম। বুঝেছিলাম, বিপ্লবে বিজয়ের যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে মৃত্যুর বেদনাও।”
চে গুয়েভারা ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে এ্যাডলফ্ মেনা গঞ্জালেস নামে উরুগুয়ের ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে বলিভিয়ায় পৌঁছান। যদিও ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর দেশটির সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে একটা গেরিলা অভিযানের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ধরা পড়েন চে গুয়েভারা।
ফিদেলের দূরদর্শীতা আর নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল তার বিপ্লবী সহযোদ্ধা চে গুয়েভারা’র। ১৯৫৬ সালের গোড়ার দিকে কিউবার জনগণের উদ্দেশে এক ভাষণ দেন ফিদেল কাস্ট্রো। সেবার বলেছিলেন, “আমরা হয় মুক্ত হব, নয় তো শহীদ হব!” ফিদেলের সেই ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে চে রচনা করেন তার সেই বিখ্যাত কবিতাটি।
‘ফিদেলের জন্য কবিতা’
চলো যাই
অগ্নিময় প্রত্যুষে
বালুকাময় আঁকা বাঁকা নির্জন পথ পেরিয়ে
তোমার ভালোবাসার সবুজ স্বপ্নময়
দেশের মুক্তির জন্য।
চলো যাই
জমাট বাঁধা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে
আমাদের ললাটে অসংখ্য বিদ্রোহের তারা জ্বলছে
শপথের বহ্নিতে না হয় আমরা মরবো
অথবা জিতবো
যখন প্রথম বুলেটের শব্দে দেশ জেগে ওঠে
কারুময় ঘুম থেকে আচমকা কোন এক বালিকার মতোন
তখনো অবিচলিত থেকো, হে যোদ্ধা
আমরা তোমার পাশেই আছি...
থাকবো।...
যখন তুমি জোর প্রচার করো:
জমি-সংস্কার, ন্যায়, রুটি-রুজি আর
স্বাধীনতার
তখন আমরাও তোমার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করি:
আমরাও আছি;
আমাদের মুক্তির লক্ষ্যবানে
যখন বিপক্ষের বন্যপশুরা হতাহত হয়:
তখনো আমরা তোমার সাথে থাকি,
আমাদের হৃদয় গর্বে স্ফীত হয়:
আমরা সেখানে আছি।
বিপক্ষের সজ্জিত সৈন্যের নেকড়ে আক্রমণে
আমাদের প্রস্তাবিত সঙ্কল্পের ভিত কখনো
টলবে না। আমরা চাই:
একটি রাইফেল, কিছু বুলেট
আর
লাঠিসোঁটা।
তবু যদি
বিপক্ষের রাইফেলগুলো ভীষণ গর্জে ওঠে
এবং ইতিহাসের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গে যদি
আমরা লীন হয়ে যাই
তখন কেবল আমাদের এইটুকুই চাওয়া:
কিউবার অশ্রু যেন
যুদ্ধে মৃত সৈনিকের এক একটি
কাফন হয়।
জারিফ





