আগামী ৭ মে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টি মূল প্রতিদ্বন্ধী এবং এই নির্বাচনকে ঘিরে সরব সমস্ত যুক্তরাজ্যবাসী ও যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ।

এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ১১ জন সৌভাগ্যবান প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করার টিকেট পেয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম প্রার্থী হলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকী।

বর্তমান এমপি রুশনারা আলীও প্রার্থী। এদিকে সম্প্রতি একটি সিটি মেয়রের পদ থেকে নানা অভিযোগে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লুৎফর রহমানকে বরখাস্ত করেছে বৃটিশ সরকার।

উল্লেখ্য, ৯৭ সালের নির্বাচনের পর এটাই রেকর্ড সংখ্যক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদের বৃটেনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতার সুযোগ। আর সেই সুযোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালের নির্বাচন থেকে। বাংলাদেশী ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটেনের নাগরিকরা বৃটেনের মাটিতেই যুগ যুগ ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছিলেন; আজ সেই বাঙ্গালীরাই বৃটিশ নাগরিকদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়ে বৃটেনের জাতীয় নির্বাচনে পর্যন্ত অংশ নিচ্ছেন।

অদ্য ২৭ এপ্রিলের ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে ড. মূসা বিন শমশেরের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, লেবার পার্টি নেতা টনি বেøয়ারকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি পড়ে বাংলাদেশীদের উপর। তখন থেকেই নির্বাচনে বাংলাদেশী প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হতে থাকে।

উল্লেখ্য, এশিয়ান এই ধনকুবের ড. মূসা বিন শমশের ও লেবার পার্টির নেতৃত্বের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ব্যাপারটা বিশ্বব্যাপী বরাবরই রহস্য ঘেরা। পশ্চিমা সাংবাদিক মহল এবং বিশ্বের অন্যান্য মিডিয়া দীর্ঘদিন থেকে ব্যর্থ পরিশ্রম করে আসছে এ রহস্য উদঘাটনে।

তবে বেশ কিছুদিন আগে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ উচ্চ পদস্থ অর্থনৈতিক বিভাগের প্রাক্তন এক পরিচালক যে বর্ণনা দিয়েছেন সেটা হল, ১৯৭৬ সাল থেকে প্রায় ৯০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ধনকুবেরের ইংল্যান্ডে বিশাল ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা ছিল। তার সেখানে ছিল বিশ্বের অন্যতম এক আধুনিক অস্ত্র কারখানা।

কনজারভেটিভ পার্টির সাথেও তাঁর বলতে গেলে সুসম্পর্কই ছিল। ৮২ সালের পর থেকে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ইরাকে অস্ত্র বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ড. মূসার উপর গোয়েন্দাগিরি, ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশী ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণে কনজারভেটিভদের সাথে টানাপোড়েন শুরু হয়।

তার একমাত্র চাওয়া ছিল বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদেরকে পশ্চিমা বিশ্বে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদাকর অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বৃটেনের মাটিতে দেখে আসছিলেন এদের প্রতি অবহেলো। তাদের নাগরিক মর্যাদা বৃদ্ধিই ছিল প্রিন্স মূসা বিন শমশেরের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।

সর্বোপরি ৯১ সালে বিশ্ব বিখ্যাত বিসিসিআই ব্যাংককে দেউলিয়া ঘোষনা নিয়ে সরকারের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন ড. মূসা বিন শমশের। কারণ সেই ব্যাংকে এই ধনকুবের কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড হারান।

ড. মূসা মনে করতেন মুসলিম পুঁজিবাদী শক্তির বিরোধে পশ্চিমাদের বিমাতাসুলভ আচরণ জঘন্য এক ষড়যন্ত্র। কনজারভেটিভের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার ও আর্থিক সহযোগিতা দান বন্ধ করে ড. মূসা বিন শমশের টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং ১৯৯৪ সাল থেকে লেবার পার্টিকে অর্থায়ন করতে শুরু করেন।

মূসা বিন শমশের ৯৭ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে পরবর্তীতে আরো ২টি জাতীয় নির্বাচনে সর্বমোট প্রায় ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করেন। ফলে মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর প্রমুখের প্রতাপশালী কনজারভেটিভদের হটিয়ে লেবার পার্টি ১৯ বছর পর পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়।

একথা সর্বজনবিদিত সত্য যে, লেবার পার্টির এই ক্ষমতায় যাওয়ার পেছনে যিনি সবচেয়ে বেশি আর্থিক ব্যয় নির্বাহ করেছেন তিনি আর কেউ নন দীর্ঘদিন বৃটেনে বসবাসকারী বিশ্বের অন্যতম অস্ত্র ব্যবসায়ী ড. মূসা বিন শমশের। যাকে সারা দুনিয়ায় অস্ত্র ব্যবসার পথিকৃৎ বলা হয়।

ড. মূসার লেবার পার্টিকে অর্থায়ন নিয়ে তৎকালীন বৃটিশ মিডিয়াসহ সারা বিশ্বে অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি হয়। ড. মূসার অর্থায়নের বিষয়টি আজও বৃটেনে জাতীয় ব্যয় সংক্রান্ত আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। লেবার পার্টিকে ড. মূসার অর্থায়ন নিয়ে দুই ধরনের ভাষ্য রয়েছে। নব্বই দশক ধরে একটি গ্রুপ এখনো মনে করে প্রিন্স মূসাই লেবার পার্টির মূল অর্থদাতা। অন্য গ্রুপের বক্তব্য লেবার পার্টি হয়তো ড. মূসাকে অর্থ ফেরৎ দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এখনো রহস্যাবৃত এবং বিশ্ব মিডিয়া গত ১৮ বছর ধরে এ নিয়ে বিতর্ক করে আসছে।

এসএইচ