ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজ পিএসসি ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ম্যানাসে বর (Menashe Bar)-এর সম্মানে তার বাসায় নৈশভোজের আয়োজন করেন। ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পর্ক না থাকায় ওই দেশের রাষ্ট্রদূতের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করায় রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজ পিএসসিকে অক্টোবর মাসের মধ্যে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজ পিএসসি গত ৩০ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেই তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনের মহাপরিচালকের কাছে রিপোর্ট করেন। রবিবার তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের কাছে রিপোর্ট করার কথা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের পাসপোর্টেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো প্রকার কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া আইন লঙ্ঘনের শামিল। তাই ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আসেম (এশিয়া ও ইউরোপের ৫১টি দেশের আন্তঃমহাদেশীয় ফোরাম) সম্মেলনে যোগ দিতে ইতালী যাওয়ার আগে এই বিষয়ে বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নেই। বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজ দেশে ফেরার আদেশ রদ করতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করেছেন। কিন্তু সেই তদবির কাজে না আসায় দেশে ফেরার পর আবার তদবির করছেন, অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদায়নের জন্য। তিনি (রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য শেখ কামালের বন্ধু ছিলেন— এই বলে তিনি এখন অন্য দেশের রাষ্ট্রদূত হওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন সদস্য এই বলেও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রসঙ্গত, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ম্যানাসে বর (Menashe Bar)-এর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গমেজ পিএসসি মুঠোফোনে নৈশভোজের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ওনাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। উনি আসলে মুরুব্বি শ্রেণীর এবং এখানে সকলের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। সকল রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার খুব ভাল সম্পর্ক। আমার সঙ্গেও তার খুব ভাল সম্পর্ক। ম্যানাসে বর (Menashe Bar) খুব ভাল কূটনীতিক। তাই তাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আর ওই নৈশভোজের দাওয়াতে আরও ১৪-১৫ জন রাষ্ট্রদূত ছিলেন।’
কূটনীতিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কোনোভাবেই ওই দেশের রাষ্ট্রদূতকে দাওয়াত করে আপ্যায়ন করা যায় না। এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও তাকে দাওয়াত দেওয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি বিরুদ্ধ। আমাদের রাষ্ট্রদূত এক্ষেত্রে কলঙ্কজনক কাজ করেছেন।’
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কূটনীতিকদের কিছু বিধি-নিষেধ আছে, যা তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও মেনে চলতে হয়। ইসরায়েলের প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশ হচ্ছে, ওই দেশের কারো সঙ্গে হাতও মেলানো (হ্যান্ডশেক) যাবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস বিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রদূত ইসরায়েলের কাউকে দাওয়াত দিয়ে আপ্যায়িত করলে তা অবশ্যই ফরেন পলিসির লঙ্ঘন। কেননা, আমাদের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্ক নাই।’
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল মেসেজ দিয়েছে, যা খুবই বাজে (ব্যাড) ঘটনা ঘটেছে।’
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন এবং অধিবেশন শেষে দেশে ফিরে প্যালেস্টাইনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন। শুধু তাই নয়, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরে শেখ হাসিনার নির্দেশে কূটনীতিকভাবে জাপানকে দিয়েও প্যালেস্টাইনের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন আদায় করেন। ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্যেই বিরূপ মনোভাব এবং ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন। এই অবস্থায় একজন রাষ্ট্রদূত কোনোভাবেই ইসরায়েলের কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে না।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুলাই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলী সহিংতায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ করেন। তিনি অনতিবিলম্বে প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলী আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি কামনায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
এ ছাড়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গত ২২ জুলাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের আজ এক হৃদয় ভারাক্রান্ত মনে এখানে কথা বলতে হচ্ছে, যখন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ইসরায়েল কর্তৃক আন্তর্জাতিক সকল বিধি-নিষেধ অমান্য করে ফিলিস্তিনিদের ওপর অমানবিক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী এ হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।’
এএইচ





