আওকিগাহারা বনের পরিচিতি একেবারেই আলাদা। জাপানের এই বনটি কুখ্যাতি লাভ করেছে ‘আত্মহত্যার বন’ হিসেবে।

আবেগপ্রবণ জাপানিরা আত্মহত্যার জন্য বেছে নিচ্ছে এই বন। এমনকি গল্প-উপন্যাসেও এই বনকে তুলে ধরা হচ্ছে আত্মহত্যার আদর্শ স্থান হিসেবে। জাপানি ভাষায় লেখা বেস্ট সেলার বই ‘ওয়াতারু টিসুরুমুই’য়ে (আত্মহত্যার ঘটনাপ্রবাহ)ত আওকিগাহারা বনকে আত্মহত্যার জন্য সবচেয়ে নিখুঁত জায়গা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। এসব কারণে বনের মধ্যে মানুষের আত্মহননের রেকর্ড দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১৯৯৮ সালে বনটিতে ৭৩টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০২ সালে পাওয়া গেছে ৭৪টি মৃতদেহ। ২০০৬ সালে রেকর্ড করা হয়েছে ১৬টি আত্মহত্যার ঘটনা।

আত্মহত্যার জন্য আওকিগাহারা বনাঞ্চল এখন এতটাই পরিচিত যে কর্তৃপক্ষ এই বনাঞ্চলে ঢোকার মুখেই বড় একটি নোটিশ ঝুলিয়েছে, ‘দয়া করে আরেকবার ভাবুন, যদি সত্যিই কোনো সমস্যা থাকে অথবা ঝামেলায় পড়েন, পুলিশের সাহায্য নিন। মৃত্যুর আগে দয়া করে আরেকবার নিজের কথা ভাবুন।’ তবে নোটিশ বোর্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বনের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে।

বনের আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, যারা আত্মহত্যা করতে আসে, তারা আগে থেকেই ঠিক করে আসে জীবনের ইতি টানবে এখানেই। নোটিশ বোর্ডের দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজনই মনে করে না তারা। এসব মানুষকে ফেরানোর আর কোনো উদ্যোগ কেন নেওয়া হয় না এই প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মুখ দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই কে নিজেকে শেষ করার জন্য এসেছে, আর কে শোভা উপভোগের জন্য বনের মধ্যে ঢুকছে।

আওকিগাহারা বনের এখানে-সেখানে মানুষের ব্যবহার্য জিনিসপত্র পড়ে আছে। ট্যাবলেটের পাতা, গল্পের বই, পানির ক্যান বলে দিচ্ছে কিভাবে জীবনের শেষ সময়টা কাটিয়েছে একজন মানুষ। বনে রয়েছে একটি বিশেষ স্থান, যার এক পাশে পবিত্র পর্বতশৃঙ্গ ফুজি এবং অন্য পাশে ঘন বন। বনের এই অংশটি এতই ঘন যে একটু দূরের মানুষও মৃত্যু চিৎকার শুনতে পায় না। ফলে স্থানটি আত্মহত্যার জন্য আদর্শ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এত জায়গা থাকতে এই বনে এসেই কেন মরতে হবে? কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শান্তিতে মরা যাবে এই ভেবে বনটিকে অনেকে বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া সমাজবিজ্ঞানীদের দাবি, ‘ওয়াতারু টিসুরুমুই’ বইটি অনেককে এখানে এসে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করে। তবে বনের মধ্যে যাদের লাশ পাওয়া গেছে, তারা সবাই যে আত্মহত্যা করেছে এমন ধারণারও ঘোর বিরোধী কোনো কোনো বিশ্লেষক।

গহিন বনাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ লৌহ এবং ভেতরের গুল্ম-লতাপাতা পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক ফাঁদ রয়েছে। সেখানে অসাবধানে একজন মানুষ সহজেই আটকে যেতে পারে। এই মৃত্যুফাঁদগুলো অনেকের জীবন কেড়ে নেয়।
বনের মধ্যে পুলিশ স্থাপন করেছে একটি জরুরি কক্ষ, যাতে সংকটাপন্ন মানুষের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।