বৃটেনের ক্যাম্পাসগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে যৌন হয়রানি। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী প্রদর্শন বা নারী স্বাধীনতার (lad culture) আড়ালে বিস্তার লাভ করছে অপ্রত্যাশিত যৌন উত্যক্ততা।
সাম্প্রতিক এক অনলাইন জরিপে দেখা যায়, এক তৃতীয়াংশেরও বেশি নারী অপ্রত্যাশিত যৌন হয়রানি ও উত্যক্ততার শিকার হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।
বৃটেনের ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস (এনইউএস) কর্তৃক পরিচালিত ওই গবেষণা জরিপে মোট ২,১৫৬জন নারী ও পুরুষের সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ নারী এবং ১২ শতাংশ পুরুষ অপ্রত্যাশিত যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এসব নারী-পুরুষরা ক্যাম্পাসে অবস্থানকালে বিভিন্ন সময়ে তাদের স্পর্শকাতর অঙ্গে অন্যরা অনাকাঙ্খিতভাবে স্পর্শ, নাড়াচাড়া কিংবা অন্য যেকোনভাবে টাচ করেছে যা বৃটেনের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে জরিপে এই ধরনের হয়রানিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
জরিপ পরিচালনার পর গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনইউএস-এর প্রেসিডেন্ট টনি পিয়ার্স ক্যাম্পাসে বিদ্যমান এই পরিস্থিতির দায় স্বীকার করে এই সমস্যা মোকাবেলায় ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
অনলাইনভিত্তিক এই জরিপে বৃটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী প্রদর্শনের নামে যে অনাকাঙ্খিত অবস্থা বিরাজ করছে তার একটি চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনইউএস এই নারী প্রদর্শণ সংস্কৃতিকে (lad culture) ধর্ষণ ও যৌন হয়রাণি এড়িয়ে যাওয়ার এক ধরনের হাস্যকর প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জরিপ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নবীন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব তরুন-তরুনীর আগমন ঘটে তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশে শুরুতেই কুদৃষ্টিজনিত যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জরিপে অংশ নেয়া নারীদের তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৬ শতাংশ) বলেছেন, তারা তাদের শরীর নিয়ে বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত ও যৌনতাপূর্ণ মন্তব্য শুনেছেন। অপরদিকে, এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে জরিপে অংশ নেয়া ১৬ শতাংশ পুরুষকে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশ বলছেন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময়ে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য সহ্য করতে হয়। বাকী এক তৃতীয়াংশ অবশ্য বলছেন, নারী-পুরুষভেদে নানা ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে হয়রানি করা হয়।
জরিপে দেখানো হয় যে, ক্যাম্পাসের যেসব জায়গায় অনেকেই জড়ো হন, সেই সব পরিবেশেও হর-হামেশা বিভিন্ন ধর্ষণ ও যৌন উত্তেজক কৌতুক বলা হচ্ছে।
জরিপ উত্তরদাতাদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেসব প্রদর্শনমূলক উপাদান বিশেষ করে যৌন আবেদনময়ী ছবি আছে সে সম্পর্কে তারা সচেতন।
উত্তরদাতাদের ৫১ শতাংশ নারী এবং ৩৩ শতাংশ পুরুষ এটা স্বীকার করেছেন যে এসব ছবি প্রায়শই তাদের মধ্যে অস্বস্তিবোধের উদ্রেক করে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, একজন নারীর উলংগ ছবি যার চারপাশে রয়েছে কয়েকজন উৎসুক শিক্ষার্থীর ছবি অথবা কোনকিছুতে চুম্বনরত কিশোরীদের ছবি।
এক চতুর্থাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ছেলে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে ক্যাম্পাসে যেসব তৎপরতা চলে সেব্যাপারে তারা সচেতন। এছাড়া ৬৩ শতাংশ নারী এবং ৪৩ শতাংশ পুরুষ মনে করেন এ ধরনের তৎপরতার মধ্য দিয়ে নারীদের অসৌজন্যমূলক উপস্থাপনের প্রয়াস চালানো হয়।
পক্ষান্তরে, জরিপে দেখা যায় যে, শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে চলাফেরার ব্যাপারে কোন নীতিমালা বা বিধি-নিষেধ এবং আচার-আচরণের বিষয়ে কোন গাইডলাইনে দেয়া থাকে না।
এই জরিপের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে অনলাইন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনইউএস ছোট্ট পরিসরে কিছু ছাত্র ইউনিয়নে বড় পরিসরে কাজ শুরু করেছে। নারী প্রদর্শন সংস্কৃতির (lad culture) প্রভাব এবং এ থেকে উত্তরণ না হলে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ-মেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণসহ নানা উদ্যোগও নিয়েছে সংস্থাটি।
এনইউএস সভাপতি পিয়ার্স আরও বলেন, ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি ভয়াবহ মাত্রায় বাড়তে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এমন আশ্বাসের কথা শোনা যায় না-কোন ভয় বা শঙ্কার কারণ নেই।
তিনি বলেন, অত্যন্ত দু:খের বিষয়, ক্যাম্পাস জীবনে এই উপাদানগুলো বিরাজমান। কারণ আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এটা জানতে পেরেছি। সুতরাং এখন এটা এড়িয়ে যাবার কোন অবকাশ নেই। আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে সবাইকে একযোগে এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
'এভরিডে সেক্সিজম' ক্যাম্পেইনের এ্যাম্বাসেডর লরা বেইটস অনেকটা হতাশার সুরে বলেন, শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেয়া বা যেকোন উপায়ে টাচ করা বৃটিশ আইনে যে যৌন হয়রানি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেটাই অধিকাংশ শিক্ষার্থী জানেননা বা এ ব্যাপারে উদাসীন। আর এটাই হচ্ছে আরেকটি বড় সমস্যা।
উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অনলাইনভিত্তিক জরিপটি পরিচালনা করা হয়। (সূত্র: দি গার্ডিয়ান)
বৃটেনের প্রভাবশালী গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে এ সংক্রান্ত মূল খবরটি যারা পড়তে আগ্রহী তারা নিচের লিংকে ক্লিক করতে পারেন:
http://www.theguardian.com/education/2014/sep/15/sexual-harassment-rife-universities-nus-survey





