ফ্রান্সে গত মাসে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি দৃশ্য। সেখানে ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের বিক্ষোভস্থল থেকে টেনে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। সন্তানদের ভাঙচুরের ঘটনায় অভিভাবকদের জরিমানা করার পরিকল্পনা বিবেচনায় থাকায় তাদের এমন উদ্যোগের কারণ থাকতে পারে।
ফ্রান্সে প্রথমে বিদ্যালয়ের ভবনের দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট ও সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে এতে যোগ দেন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষ। ইতালির বিভিন্ন শহরেও তরুণদের নেতৃত্বে একই ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এসব বিক্ষোভের কিছু সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
ফ্রান্স ও ইতালিতে এসব ঘটনায় কী ঘটছে, অভিভাবকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং অন্য দেশগুলোতে এ বিষয়ে কী ধরনের আইন রয়েছে, তা নিয়ে এই প্রতিবেদন।
ফ্রান্স ও ইতালিতে বিক্ষোভের কারণ কী?
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিসের উত্তরের শহরতলি সেইন-সাঁ-দেনিতে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বিদ্যালয়ের ভবনগুলোর বেহাল অবস্থা ও শিক্ষকের ঘাটতি ছিল তাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়েও তারা অসন্তুষ্ট ছিলেন। ওই বাজেটে সরকারি ব্যয় থেকে কয়েক মিলিয়ন ইউরো কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্যারিসের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সামনে ব্যারিকেড তৈরি করেন। পরে ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে প্রথম সপ্তাহেই শত শত বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়।
একপর্যায়ে সরকারি খাতের কর্মীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন। পরিকল্পিত বেতন স্থগিতের প্রতিবাদে তারা আন্দোলনে অংশ নেন। এরপর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পেট্রলের সংকট ও জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষও বিক্ষোভে যোগ দেন। এসব কর্মসূচির অনেকগুলোই পরে দাঙ্গা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নেয়।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, সহিংসতার কোনো যুক্তি নেই। প্রয়োজন মনে করলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারে বলেও তিনি জানান। এ ছাড়া ফরাসি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়।
তবে গত শনিবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন কয়েক লাখ মানুষ। বিক্ষোভগুলো মূলত বিচ্ছিন্নভাবে আয়োজিত হয়েছিল।
ইতালির মিলানে সপ্তাহান্তের বিক্ষোভ প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে তা দাঙ্গায় রূপ নেয়। মূলত তরুণদের কয়েকটি দল দোকানপাটে লুটপাট চালায়, জানালা ভাঙচুর করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর, রাস্তার পাথরের টুকরা ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন। তারা টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেন।
ইতালির বোলোনিয়া ও তুরিন শহরেও দাঙ্গার খবর পাওয়া যায়। তবে ফ্রান্স ও ইতালিতে এসব ঘটনায় কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার সরকারি হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ইতালিতে অভিভাবকদের দায় বাড়াতে কী পদক্ষেপ?
মঙ্গলবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার সহিংসতা মোকাবিলায় একগুচ্ছ পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বছরের শেষ পর্যন্ত মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন এবং ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত সন্তানদের অভিভাবকদের আর্থিক দায়বদ্ধতা বাড়ানো।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত পাঁচজনের কোনো দলের অংশ হয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় কেউ জননিরাপত্তা বিপন্ন করলে তার সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ২০ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। মার্কিন ডলারে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৪৬০ ডলার।
১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি বিক্ষোভকারীদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিকভাবে আটক রাখার বিধান রাখা হয়েছে। কোনো অপরাধ না করলেও তাদের আটক করা যেতে পারে, যদি তাদের বিপজ্জনক হওয়ার বিষয়ে প্রমাণ থাকে। আগে এ ধরনের ক্ষমতা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
নতুন ডিক্রির একটি অংশে ‘ভাঙলে দাম দিতে হবে’—এই নীতির আওতায় সন্তানদের অপরাধমূলক ভাঙচুরের জন্য অভিভাবকদের দায়ী করার আইন আরো কঠোর করা হয়েছে।
ইতালির দেওয়ানি আইনের ২০৪৮ ধারায় আগে থেকেই বলা আছে, যেসব অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান আইনগতভাবে স্বাধীন নয় এবং অভিভাবকের সঙ্গে বসবাস করে, তাদের বেআইনি কাজের কারণে ক্ষতি হলে মা-বাবা ও অভিভাবকেরা তার দায় বহন করবেন। অভিভাবকত্বের অধীনে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। পালক অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম কার্যকর।
ইতালিতে কর্তৃপক্ষ সম্পত্তি জব্দ করা কিংবা বেতন থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের দায় আদায় করতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র সরাসরি অভিভাবকদের জরিমানা করতে পারবে অথবা ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য তাদের সম্পত্তির ওপর দাবি জানাতে পারবে। পরিবার যে সরকারি ভর্তুকি বা সহায়তা পায়, সেখান থেকেও অর্থ কেটে নেওয়া যেতে পারে।
ফ্রান্সে কী আইন রয়েছে?
ফ্রান্সের দেওয়ানি আইনের ১২৪২ ধারা অনুযায়ী, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তানের সঙ্গে বসবাস করেন এবং সন্তানের ওপর অভিভাবকত্বের ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, সন্তানদের ঘটানো ক্ষতির জন্য তাদেরও দেওয়ানি দায় রয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, অভিভাবকত্বের ক্ষমতা থাকা মা-বাবা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ঘটানো ক্ষতির জন্য যৌথভাবে ও সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবেন। তবে প্রশাসনিক বা বিচারিক সিদ্ধান্তে সন্তানকে কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে রাখা হলে এই বিধানের ব্যতিক্রম হতে পারে।
গত বছর নতুন একটি আইনের মাধ্যমে ১২৪২ ধারায় সংশোধন আনা হয়। এর লক্ষ্য ছিল কিশোর অপরাধবিষয়ক বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের ভূমিকা আরো জোরদার করা। সংশোধনের ফলে দেওয়ানি দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের একই বাড়িতে বসবাসের শর্তটি তুলে দেওয়া হয়।
ফ্রান্সে সন্তানদের কারণে হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে আদায় করা যায়। দায়বদ্ধতার বিমা থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া না হলে অভিভাবকদের সম্পত্তি জব্দ করেও অর্থ আদায় করা হতে পারে। এ ধরনের বিমা প্রায়ই বাড়ির বিমার সঙ্গে যুক্ত থাকে। তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কি না, তা বিমার চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করে।
শুক্রবার ফরাসি বেতারমাধ্যম আরএফআই জানায়, সহিংস বিক্ষোভের জবাবে সরকার ‘দাঙ্গাকারীরা ক্ষতিপূরণ দেবে’—এমন একটি নতুন খসড়া আইন প্রস্তাব করছে। আগামী ২৭ অক্টোবর এ খসড়া নিয়ে সরকারের আলোচনা করার কথা রয়েছে।
আইনটি পাস হলে ভাঙচুরের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। মার্কিন ডলারে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ২০০ ডলার। অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধমূলক ভাঙচুরের ঘটনায় তাদের মা-বাবাকে দায়ী করার বিধানও থাকতে পারে।
আরএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত আইনে দলগত দেওয়ানি দায়বদ্ধতার বিধান যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে কোনো দল ভাঙচুরের জন্য দায়ী হলে, সেই দলের এমন কাউকেও ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে, যিনি নিজে সরাসরি ক্ষতি করেননি। এ ক্ষেত্রে তাকে সরাসরি ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মতোই আর্থিক দায় বহন করতে হতে পারে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁন লেকর্নু এই আইনকে ‘একেবারেই অপরিহার্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, বিক্ষোভের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির খরচ যেন করদাতাদের বহন করতে না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই আইন প্রয়োজন।
অন্য দেশগুলোতে কী নিয়ম রয়েছে?
বিভিন্ন দেশেও সন্তানের ঘটানো ক্ষতির জন্য অভিভাবকদের আর্থিক দায় বহনের বিধান রয়েছে। তবে দেশভেদে এসব বিধানের শর্ত ও সীমা আলাদা।
সুইডেনে কোনো শিশু অপরাধ করলে এবং তার কারণে অন্য কারো শারীরিক ক্ষতি বা সম্পত্তির ক্ষতি হলে, নির্দিষ্ট আইনি শর্ত ও সীমা অনুযায়ী মা-বাবা বা আইনগত অভিভাবকদের আর্থিক দায় বহন করতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেও অঙ্গরাজ্যভেদে অভিভাবকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে আলাদা আইন রয়েছে। এসব আইনের আওতায় কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি সম্পত্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা যানবাহন নষ্ট করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা স্থানীয় সরকার দেওয়ানি আদালতে তার মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও দায় নির্ধারণের শর্ত ও ক্ষতিপূরণের সীমা অঙ্গরাজ্য অনুযায়ী ভিন্ন।
আলজাজিরা
এমএম











