বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলজাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সামলাতে বিভিন্ন দেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে চলমান এসব আন্দোলনের কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি ঋণে শীর্ষ ১০ দেশ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সরকারি ঋণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশের সমান।
সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির ঋণ প্রায় ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণ প্রায় ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৯৯ শতাংশ।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। প্রায় ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১৮

দশমিক ৫ শতাংশ।
ইতালির সরকারি ঋণ প্রায় ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির ঋণ প্রায় ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
প্রায় ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারি ঋণ নিয়ে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৮৩ শতাংশ। নবম অবস্থানে থাকা কানাডার সরকারি ঋণ প্রায় ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১১৬ শতাংশ। আর দশম অবস্থানে থাকা ব্রাজিলের ঋণ প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৯৭ শতাংশ।

ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম
বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ।
২০১০ সালে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে দেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। তবে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো কম।
কীভাবে ঋণ নেয় সরকার?
সরকার সাধারণত বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ড কিনলে সরকার নির্দিষ্ট হারে সুদ দেওয়ার পাশাপাশি মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
যেমন, কোনো বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিয়ে ১০ বছর মেয়াদি বন্ড কিনলেন এবং এর সুদের হার ৫ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে তিনি বছরে ৫ ইউরো করে ১০ বছরে মোট ৫০ ইউরো সুদ পাবেন। মেয়াদ শেষে মূল ১০০ ইউরোও ফেরত পাবেন।
সরকারি বন্ডের ‘ইয়েল্ড’ বা ফলন বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত আয় নির্দেশ করে। পাশাপাশি এটি সরকারি ঋণের ঝুঁকি ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে আর্থিক বাজারের মনোভাব বুঝতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঋণের সুদ বাড়লে কী প্রভাব পড়ে?
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেড়েছে। দেশটি ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। একই মেয়াদের জার্মান বন্ডের সুদের হার প্রায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেশি।
বন্ডের সুদের হার বাড়লে সরকারকে নতুন ঋণের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোনো দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়লে তাঁরা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে বেশি সুদ দাবি করতে পারেন। এতে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বেড়ে যায়।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এই চাপ সামলাতে দেশটির সরকারকে বাজেট ঘাটতি কমানো এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিতে প্রভাব
বৈশ্বিক ঋণ সংকটের প্রভাব শুধু সরকারি বাজেটে সীমাবদ্ধ নয়। সুদের হার বাড়লে বাড়ি ও গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদও বেড়ে যেতে পারে। এতে পরিবারের মাসিক ব্যয় বাড়ে এবং ভোগ ও বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে।
অন্যদিকে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমতে পারে।
সরকারের ক্ষেত্রে সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ার অর্থ হলো শিক্ষা, হাসপাতাল, সড়ক, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয়ের জন্য তুলনামূলক কম অর্থ হাতে থাকা। ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো, উন্নয়ন ব্যয় কমানো কিংবা নতুন করে ঋণ নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
মাথাপিছু ঋণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ৪৪ হাজার ডলার। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
আইআইএফের তথ্য বলছে, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।
এই ব্যয় বিশ্বে সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যয় হওয়া ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় হওয়া ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি।
সূত্র: আলজাজিরা
এস
















