মাত্র এক সপ্তাহও ভারত সরকার অটল থাকতে পারলো না তার সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর। অবশেষে ৫ দিনের মাথায় পর্নোসাইট প্রেমীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হলো মোদি সরকারকে। তুলে নেয়া হলো অধিকাংশ পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটের ওপর সম্প্রতি আরোপিত নিষেধাজ্ঞা।

ভারতীয় গণমাধ্যমর বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়, নানামহল থেকে প্রবল চাপের মুখে পড়ে অধিকাংশ পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটের উপর থেকে নিষেধা়জ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে যে সমস্ত সাইটে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি দেখানো হয়, সেগুলির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে।

উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই (২০১৫) টেলি-যোগাযোগ দফতরের নির্দেশমতো ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর (আইএসপি) মাধ্যমে ৮৫৭টি পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয়া হয়।

‘ব্লকিং’-এর আওতায় এসেছিল অন্যান্য কিছু সাইটও। যেমন, বিভিন্ন ডেটিং সাইট বা প্রাপ্তবয়স্ক জোক্‌স সাইট। মানুষের নৈতিক চেতনায় আঘাত লাগছে এই কারণ দেখিয়ে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার।

তবে, আকাশ সংস্কৃতির নামে অশ্লীলতার সয়লাবে ডুবন্ত ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে সরকারি এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ করে সরকার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে এমন দাবিতে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।

এমনকি সব ধরনের পর্নোগ্রাফি সাইট ব্লক করার এই সিদ্ধান্ত আদৌ বাস্তবসম্মত কিনা- এমন প্রশ্ন করতেও কার্পন্য করেনি অনেকে। দেশটাকে তালেবান রাষ্ট্র বানানো হচ্ছে কীনা সরকারের কাছে এমন প্রশ্ন রাখেন অনেক প্রতিবাদকারী।

তার থেকে বরং শুধু চাইল্ড পর্নোগ্রাফি সাইট ব্লক করার চেষ্টা করা হলে কাজে দেবে, মত প্রকাশ করেন দেশটির ওয়েবসাইট বিশেষজ্ঞেরা।

এদিকে, এমন সমালোচনার মুখে রীতিমতো ভড়কে যায় ভারত সরকার। আজ (৫ আগস্ট ২০১৫) তড়িঘড়ি করে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকেন টেলিকমমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। বৈঠকে ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি সচিব আর এস শর্মা এবং অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল পিঙ্কি আনন্দ।

বৈঠক শেষে টেলিকমমন্ত্রী জানান, যে সব সাইটে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত বিষয়বস্তু নেই, অবিলম্বে সেগুলির উপর থেকে ‘ব্লকিং’ তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে আইএসপিগুলিকে।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টও এর আগে বলেছিল, সব ধরনের পর্নোগ্রাফি সাইট ব্লক করে দেওয়া ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপেরই নামান্তর।

তবে আইএসপিগুলি সেই নির্দেশ ইতিমধ্যেই কার্যকর করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পর্নো সাইট খুলছে না বলে খবরে প্রকাশ।

কিন্তু ‘চাইল্ড’পর্নোগ্রাফিকে যে কোনভাবেই মদত দেওয়া উচিত নয়, সে বিষয়ে একমত সব পক্ষই। এদিকে, কাকে বলে ‘চাইল্ড’পর্নোগ্রাফি? এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নানা মহল থেকে। অবশ্য দেশটির রাষ্ট্রপুঞ্জের নির্দেশিকায় বলা আছে, যে ধরনের পর্নোগ্রাফিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করা হয়, সেটাই চাইল্ড পর্নোগ্রাফি।

তবে, সাধারণত অনেক সময়েই বয়ঃসন্ধি হয়নি, এমন শিশুদের ব্যবহার করা হলেও চাইল্ড পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহার করা হয় টিন-এজারদেরই। বিভিন্ন দেশের মতো ভারতও এই নির্দেশিকা মেনে চলে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভারতে রমরমিয়ে চলছিল বহু চাইল্ড পর্নোগ্রাফি সাইট। সেই সব সাইট ব্লক করে রাখতেই ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে বুধবার (৫ আগস্ট ২০১৫) ফের নির্দেশ দিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

টেলি-যোগাযোগ মন্ত্রকের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘যে সমস্ত সাইটে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি দেখানো হয়, ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে সেগুলি বন্ধ রাখারই নির্দেশ দিচ্ছে সরকার।’’

টেলি-যোগাযোগ দফতর সূত্রের খবর, বাকি সব পর্নোগ্রাফি সাইটের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এই যে সিদ্ধান্ত, তা সাময়িক। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ১০ অগস্টের পরে। সেই সময়ে সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলার ফের শুনানি রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

টেলিকমমন্ত্রীও বলেন, ‘‘পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তকে তালিবানি বলা হয়েছিল। সেই অভিযোগকে ঘৃণার সঙ্গে খারিজ করছি”। তাঁর আরও দাবি, ‘‘আমাদের সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে।

তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ুক। বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ যে বাক্‌ স্বাধীনতা প্রকাশ করে, তাকেও সম্মান করে এই সরকার।

উল্লেখ্য, ভারতের জনগণ বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুণ তরুণীদের একটি বড় অংশই পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। এ নিয়ে অভিভাবক থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষ মহল পর্যন্ত উদ্বিগ্ন। তাই উচ্ছন্নে যাওয়া আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতেই ৮ শতাধিক পর্নো সাইট ব্লক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু চাপের মুখে শেষমেষ সরে যেতে হলো সরকারকে তার সাহসী পদক্ষেপ থেকে। ভবিষ্যতে দেশটির আকাশ সংস্কৃতি কোথায় গিয়ে হোচট খায় সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কেবি