আফগানিস্তানে ইসলামী জাগরণ এবং তার বিকাশের পেছনে বিভিন্ন রকম প্রেরণা ও চালিকাশক্তি কাজ করেছিল। এইসব চালিকাশক্তির অন্যতম ছিল আফগানিস্তানে সাংবিধানিক স্বাধীনতা। ১৯৬৪ সালে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল সেই সংবিধানের ফলে আফগানিস্তানে বিচিত্র ক্ষেত্রে মোটামুটি স্বাধীন চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন বিভিন্ন আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, রাজনৈতিক বহু দল গঠিত হয়েছিল, সাংগঠনিক কার্যক্রমের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এসেছিল এবং এককথায় সমাজ গঠনের সুষ্ঠু ও ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণেই কাবুলে বিচিত্র ঘটনা প্রবাহ আমরা লক্ষ্য করেছি। এইসব ঘটনা প্রবাহের ফলে একদিকে যেমন আফগানিস্তানের ওপর ‘মুহাম্মাদ যায়ি’ পরিবার বা বংশসহ বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর আধিপত্য কমে এসেছিল অপরদিকে বামপন্থী এবং ডানপন্থীরাও বিভিন্ন রকম তৎপরতা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401429414.jpg[/img]
বামপন্থী চিন্তাধারার অধিকারীরা সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের কর্মতৎপরতা চালাতে পেরেছিল এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। একইভাবে যারা ইসলামী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন তারাও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীতে তাদের কার্যক্রম সুস্পষ্টভাবে চালিয়ে যাবার সুযোগ পেয়েছিলেন। এইসব আদর্শিক কার্যক্রম আহলে সুন্নাতের মাঝে যেমন লক্ষ্য করা গিয়েছিল তেমনি শিয়া মাযহাবের অনুসারী মুসলমানদের মাঝেও সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়েছিল। আহলে সুন্নাতের মধ্যকার ঘটনা প্রবাহের মধ্যে কাবুলে সংঘটিত ‘মুসলমান তরুণদের’ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা যায়। এই আন্দোলনের কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হলেন ‘গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার’, আহমাদ শাহ মাসুদ এবং তাঁদের শিক্ষক ‘বোরহান উদ্দিন রাব্বানী, সেবগাতুল্লা মাজাদ্দেদি প্রমুখ। শিয়া মাযহাবের অনুসারী মুসলিম ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকেও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যায়। যেমন সাইয়্যেদ ইসমায়িল বালখি, ওয়ায়েজ মেসবাহ এবং আলি আসগর শুয়া। এই ইসলামী চিন্তাবিদগণের প্রত্যেকেই বিভিন্ন দল, সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী জাগরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।
তাঁদের সংগঠিত কয়েকটি আন্দোলন বা সংস্থার নাম এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, হেজবে আরশাদ এবং হেযবে ওয়াতান। এই দুটি দল আফগানিস্তানে বিশেষ করে হেরাত এবং কান্দাহারে মাযহাবি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চালিয়েছিল। কান্দাহারে ছাত্র ছাত্রীদের জন্যে ‘মাদ্রাসায়ে এলমিয়ে জাফারিয়া’ প্রতিষ্ঠিত করে বহু সফল ছাত্র সৃষ্টি করেছেন। মুহাম্মাদ আসেফ মোহসেনির হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আঞ্জুমানে সুবহে দনেশ। এইসব প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ইসলামী জাগরণের ধারা ব্যাপক গতি লাভ করে। এদের মাঝে যুবকদের একটি দল মুহাম্মাদ আসেফ মোহসেনির আদর্শে বিশ্বাসী ছিল না। তাঁরা ইতোমধ্যে ইরানের ইমাম খোমেনী (রহ) এর জীবনাদর্শ ও কর্মের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘হিযবুল্লাহ’র আদর্শিক আন্দোলনের মতো একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনকে অনেকে হিযবুল্লাহ’র আফগান শাখা বলেও মনে করেন।
হেরাতেও যুবকদের একটি দল নতুন একটি আন্দোলন বা সংগঠন গড়ে তুলেছিল। সাইয়্যেদ ইসমায়িল বালখির সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ঐ সংস্থাটির প্রাথমিক নাম ছিল ‘মুজতামে ইসলামী’। পরবর্তীকালে অবশ্য এই নামটি আর থাকে নি। নামটি পরিবর্তিত হয়ে ‘হেযবে আরশাদ’ নাম ধারণ করে। খ্রিষ্টীয় ১৯৭১ সালের পর এই সংগঠনটি আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে সর্বপ্রথম তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। ‘রাদে ইসলামী’ নাম নিয়ে তারা তাদের তৎপরতা শুরু করে।
আফগানিস্তানে ইসলামী জাগরণের উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সেটা হলো আফগানিস্তানের আশেপাশের দেশগুলোতে বিভিন্ন রকম জ্ঞান অর্জনের জন্যে ছাত্ররা যেত এবং সেখানে পড়ালেখা শেষ করে ফিরে আসতো। বর্তমান আফগানিস্তানে মোঙ্গলদের আক্রমণের আগে অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় তেরো শতকে অসংখ্য মাদ্রাসা গড়ে উঠেছিল। আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহরে এগুলো গড়ে ওঠে। তবে মোঙ্গলদের পাশবিক হামলার ফলে সেইসব মাদ্রাসা ধ্বংস হয়ে যায়। মাদ্রাসাগুলো ধ্বংস হয়ে যাবার কারণে বাধ্য হয়ে আফগান যুবকরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞান অর্জন করতে চলে যায়। বিশেষ করে বোখারা, ভারত, মিশর, ইরান এবং ইরাকেই গিয়েছিল বেশি। বিগত অর্ধ শতাব্দীতে মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের সংখ্যাও কম ছিল না।
এঁদের মাঝে বোরহান উদ্দিন রাব্বানীসহ আরো অনেকেই ছিলেন। তাঁরা মিশরের বিখ্যাত সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলেমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শের সাথে পরিচিতি লাভ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সে কারণে তাঁরা আফগানিস্তানে ফিরে আসার পর মুসলিম যুবকদের সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতোমধ্যে অনেক আবার ইরানের কোমেও পড়ালেখা করেছেন। কোমে ধর্মতত্ত্ব চর্চার কাজ শেষ করে দেশে ফিরে গিয়ে ইসলামী জাগরণ তথা আফগানিস্তানের সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। যেহেতু তাঁরা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) এর আদর্শের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিতি লাভ করতে পেরেছিলেন সে কারণে আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে তাঁরা সেই আদর্শকে কাজে লাগিয়েছেন। সেজন্যেই সমকালীন আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে নতুন নতুন অনেক ঘটনা প্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে।
তবে আফগানিস্তানে বাম রাজনীতিরও চর্চা হয়েছিল। সাংবিধানিক স্বাধীনতা চর্চার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা মার্কসবাদী সংগঠন গড়ে তুলেছিল। নুর মুহাম্মাদ তারেকি’র নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি’ আর ‘নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি’ গড়ে উঠেছিল ডক্টর আব্দুর রাহিম মাহমুদি’র নেতৃত্বে। এইসব বামপন্থী রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার ফলে মুসলিম চিন্তাবিদগণ মারাত্মক সমস্যার মুখে -বলা যায়-তাঁরা অশনি সংকেতের মুখে পড়ে যান। এই বিপদ উপলব্ধি করার ফলেই ‘মুসলিম যুব আন্দোলনে’র মতো সংগঠন গড়ে উঠেছিল যারা লক্ষণীয় পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। মার্ক্সিস্ট আন্দোলনের বিকাশ এবং সরকারের সাথে তাদের সহযোগিতার ঘটনা সেইসাথে মুহাম্মাদ দাউদ খানের অভ্যুত্থান ইত্যাদির কারণে ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে একরকম নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। এছাড়া ১৯৭৮ সালে মার্ক্সিস্টদের অভ্যুত্থান এবং ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা আফগানিস্তান দখল করার ফলে ইসলামী দলগুলো আবারো নিজেদেরকে সংগঠিত করার গুরুত্ব উপলব্ধি করে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আফগানিস্তানের মানুষের রয়েছে নিজস্ব উন্নত ধরনের সংস্কৃতি। আফগানিস্তানকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়-পর্বতঘেরা একটি নয়নাভিরাম দেশ। দেশটিতে রয়েছে সভ্যতার হাজার হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস-সংস্কৃতি। বছরের প্রথম দিনটি হচ্ছে আফগানিস্তানের একটি বড় উৎসবের দিন। দেশটিতে নববর্ষ ‘নওরোজ' বলে পরিচিত। জানা গেছে, হামালের প্রথম দিন উদযাপন করা হয় নববর্ষ। যা আফগান মাম বলে পরিচিত। এটি বসন্তের প্রথম দিন। এই নববর্ষ উদযাপিত হয় ২১ মার্চ। ওই দিন নববর্ষের আনন্দে মেতে উঠে উত্তরাঞ্চলীয় নগর মাজার-ই শরিফের হাজার হাজার মানুষ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401429410.jpg[/img]
আফগানরা নববর্ষে সাধারণত সবুজ পোশাক পরতে পছন্দ করে। ওই বিশেষ দিনটিতে আয়োজন করা হয় রকমারি খাবারের। একটি বিশাল ঝান্ডা উত্তোলন করে সুঠাম বা শক্তিশালী পুরুষেরা। আফগানরা মনে করে, নওরোজ যদি ভালোভাবে উদযাপন করা যায় তবে সারা বছর ভালোই কাটবে তাদের। নববর্ষে উটের লড়াইয়ের আয়োজন করা হয় মাজার-ই-শরিফে। এ লড়াইয়ে নামানো হয় তাগড়া পুরুষ উটগুলোকে। প্রায় আধা টন করে গড় ওজন এসব উটের। রোমহর্ষক দৃশ্যের অবতারণা হয় অল্পক্ষণের মুখোমুখি লড়াইয়ে।
আফগানদের রয়েছে মুখরোচক নানা খাবারের ঐতিহ্য। অনেকে বলেন, আফগানদের খাবার দেখলে জিভের পানি সামলানো কঠিন। কাবাব কোপ্তার রকমারি খাবার খায় ওরা। যুগে যুগে সে দেশে পড়েছে বহু ভিনদেশি মানুষের পা। এতে দেশিয় খাবারের তালিকায় যোগ হয়েছে হরেক রকমের বিদেশি খাবার। এসব খাবার আনে রসনাবিলাসে নতুনত্ব। অনেক সময় খাবারের উপকরণ পরিবর্তন করেও তৈরি করা হয় হরেক রকমের মজাদার খাবার। এসব খাবার পুষ্টিসমৃদ্ধও।
আফগানিস্তানের জাতীয় খেলাকে বলা হয় ‘বুজখাসি'। খেলাটিকে বিশ্বের সবচেয়ে আদিম বা পুরনো খেলা হিসেবে দেখা হয় বাইরের দুনিয়ায়। এই খেলার প্রতিযোগিতায় একটি ছাগল জবাই দেয়া হয়। তা নিয়ে তারা ঘোড়ায় চড়ে। তারপর তা নিয়ে চলে কাড়াকাড়ির পালা। এক পর্যায়ে জবাই করা ছাগটিকে তারা ছুঁড়ে মারে চক দিয়ে আঁকা একটি বৃত্তের মধ্যে। জানা যায়, দেশটির উত্তরাঞ্চলে এ খেলা চলছে শত শত বছর ধরে। এক সময় এটি যুদ্ধবাজ (ধনী) প্রতিদ্বন্দ্বীদের খেলা ছিল। এখন এ খেলার প্রচলন ছড়িয়ে পড়েছে সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এ খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা করছে স্থানীয় মোবাইল ফোন কোম্পানি ও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো। এতে বুঝা যায়, আফগানরা মোবাইল ফোন খুবই পছন্দ করে।
আরো জানা যায়, কবিতা হলো আফগান শিল্প-সাহিত্যের প্রাণ। তাদের অনেকেই কথা বলে ছন্দে ছন্দে। যা এক হাজারের বেশি বছর ধরে চলে আসছে। বৃহস্পতিবার রাতে কবিতার আসর বসে পশ্চিমাঞ্চলীয় নগর হেরাতে। এই আসরে যোগ দেয় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও। এমনকি শিশুরাও যোগ দেয়। এখন আর বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তা এখন কত জনপ্রিয়। এই আসর চলে রাতভর। আয়োজন হয় ঐতিহ্যবাহী হিরাতি গানের জলসা।
বামিয়ান প্রদেশ রয়েছে আফগানিস্তানের কেন্দ্রস্থলে। বামিয়ান পর্বতের গুহায় বিশ্বের প্রথম তৈলচিত্র আঁকা হয় খিৃস্টপূর্ব ৬৫০ সালে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আফগানদের সংস্কৃতির ওপর কুঠারঘাত করেছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সেনারা। যা রীতিমতো বৃষ্টি ও সভ্যতার ওপর আঘাত। যা মোটেই মানতে পারছেন না আফগানরা।
(লেখাটি সংগৃহীত ও সংকলিত)
[b]ঢাকা, ৩০ মে(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস[/b]
আন্তর্জাতিক
আফগানিস্তানে ইসলামী জাগরণ এবং তার বিকাশ
আফগানিস্তানে ইসলামী জাগরণ এবং তার বিকাশের পেছনে বিভিন্ন রকম প্রেরণা ও চালিকাশক্তি কাজ করেছিল। এইসব চালিকাশক্তির অন্যতম ছিল আফগানিস্তানে সাংবিধানিক স্বাধীনতা। ১৯৬৪ সালে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল সেই সংবিধানের ফলে আফগানিস্তানে বিচিত্র ক্ষেত্রে মোটামুটি স্বাধীন চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন বিভিন্ন





