সেই পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু হয়ে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে ঠান্ডা লড়াই চলেছে তা এখনো অনেকের কাছে জীবন্ত। দুই পরাশক্তির মধ্যে কে যে কাকে ছাড়িয়ে শেষমেষ শীর্ষস্থানটি দখল করবে তা নিয়ে সারাক্ষণই টান টান উত্তেজনা ছিল গোটা বিশ্বজুড়ে।

তবে, সেই লড়াইটি যে কারণে ইতিহাসের পাতায় অন্যন্য স্থান অধিকার করে রয়েছে তা হলো সেটা যতটা না সামরিক শক্তি প্রদর্শনের লড়াই ছিল, তার চেয়ে বহুগুনে বেশি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাবার লড়াই।

প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। ইউনিয়ন ভেঙ্গ ১৫টি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। তবে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল অংশ বর্তমান রাশিয়া বার বারই সেই পুরোনো শেীর্যবীর্য পুনরুদ্ধারে মাঝে মাঝেই কিছুটা বেপরোয়া হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া তার পুরোনো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে চাইলে বিশ্বজুড়ে বর্তমান পরাশক্তি আমেরিকা যে একচেটিয়া মোড়লীপনা করছে সেখানে অবশ্যই ভাগ বসাতে হবে। সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার আকস্মিক হস্তক্ষেপ তারই অংশবিশেষ বলেই ধারণা অনেকের।    

তবে, সাম্প্রতিক রাশিয়া-আমেরিকা দ্বন্দ্বটি যেন গতানুগতিক বিশ্লেষণের একটু বাইরে। আমেরিকার নিকট অতীতের ইতিহাসে রাশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় দুই দেশের তিক্ততা এমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাবে তেমনটি হয়তো অনেকেই ভাবেননি।

আমেরিকান প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউসের আপত্তি সত্ত্বে মার্কিন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই যেভাবে বিপুল ভোটে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপের ইস্যুটি পাস হয়ে যায় তা ছিল অনেকের ধারণার বাইরে। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেট) যেভাবে নজিরবিহীন ভোট পেয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধের প্রস্তাবটি পাস হয় তাতে শেষমেষ ভেটো দেয়ার দু:সাহস দেখানটি বেপরোয়া ট্রাম্পও।

এদিকে, এই ঘটনার পর পরই রাশিয়া থেকে ৭৫৫ আমেরিকান কুটনীতিককে ১লা সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশ ত্যাগের নির্দেশ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেন বিশ্ববাসীকে।

পুতিনের এমন কঠোর পদক্ষেপটি আরো একটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে আমেরিকায় যতজন রাশিয়ান কুটনীতিক রয়েছেন, রাশিয়াতেও আমেরিকার কুটনীতিক সংখ্যা ততজনে গিয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে পুতিন আমেরিকাকে এমনই বার্তা দিয়েছেন যে, আমেরিকা ও রাশিয়া সমানে সমান। আমেরিকা নিজেকে যতই এক নম্বর সুপার পাওয়ার হিসেবে ভাবুক না কেন, রাশিয়া সেটা মনে করে না। রাশিয়া আমেরিকার মতোই সমান সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বিশ্বে টিকে থাকতে চায়। আর সেটা প্রমাণ করতে পুতিনের এমন একটি প্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়া বিকল্প ছিল না বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারো বিশ্ববাসীর কাছে কয়েকটি বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়। আর তা হলো ক্ষমতায় কে আসলো আর কে আসলো না তার ওপর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি খুব একটা পরিবর্তিত হয় না। এমন কি আমেরিকার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট চাইলেও খুব একটা কিছু করতে পারেন না।

অনেকের মতে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রাশিয়া ভেবেছিলো তিনি জিতে গেলে হয়তোবা রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন কিছুটা হ্রাস পাবে। দুই দেশের সম্পর্ক অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় নতুন মাত্রায় পৌঁছাবে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। রাশিয়ার সহায়তার বিষয়টি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে অস্বীকার করা হলেও বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ। একই সাথে পাস হয়ে গেলো অবরোধ আরোপের প্রস্তাব।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ঠান্ডা লড়াইয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রাশিয়াও আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী নয়। অপরদিকে, বিশ্বায়নের এই যুগে কারো একক কর্তৃত্ব এখন আর কেউ মেনে নিতে চায় না। পাশাপাশি এশিয়ায় চীনের প্রবলবেগে উত্থান, আমেরিকার রক্ত চক্ষুকে থোরাইকেয়ার করে উত্তর কোরিয়ার একের পর এক ক্ষেপনাস্ত্রের সফল পরীক্ষা - আর এমনই এক বাস্তবতায় আমেরিকার সাথে রাশিয়ার কুটনৈতিক লড়াই। সব মিলিয়ে অনেকেরই ধারণা আমেরিকার একক মোড়লীপণা আর বেশিদিন টিকবে না। তবে, রাশিয়াও যে সহসা তার সাবেক রুপে আবির্ভূত হবে না সে ব্যাপারেও সন্দেহ নেই কারো। কিন্তু বিশ্ব যে এক নতুন মাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে উৎসুক দৃষ্টি বিশ্বজুড়ে শতকোটি মানুষের।