ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যে এক সপ্তাহ ধরে চলা সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে এবার সংবাদপত্র প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, গতকাল শনিবার মধ্যরাতে কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একাধিক উর্দু ও ইংরেজি সংবাদপত্র জব্ধ করে পুলিশ। এর পরই দেশটিতে সব ধরনের সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, শ্রীনগরের ‘রেনগ্রেথ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট’ এলাকায় প্রথমে অভিযান চালায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এরপর কাশ্মীরের স্থানীয় পত্রিকা ‘গ্রেটার কাশ্মীর’-এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে পত্রিকাটির অনলাইন ভার্সন এখনো খোলা রয়েছে। সেখানে জানানো হয় যে, তাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া বাজেয়াপ্ত করা হয় ‘গ্রেটার কাশ্মীর’ সংবাদপত্রের কয়েকটি প্লেট ও ‘কাশ্মীর উজমা’ নামক পত্রিকার ৫০ হাজার কপি। এ সময় পুলিশ প্রকাশনা কর্মীদের গালাগালি ও মারধর করে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এছাড়া কে টি প্রেস নামের কাশ্মীরে একটি বিখ্যাত ছাপাখানায়ও অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ছাপাখানাটির মালিক রাজা মহিউদ্দিন জানান, তাঁর ছাপাখানায় কাশ্মীরের ‘কাশ্মীর রিডার’, ‘কাশ্মীর টাইমস’, ‘কাশ্মীর অবজার্ভার’, ‘দ্য কাশ্মীর মনিটর’সহ আরো বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র ছাপা হয়। তবে হঠাৎ করেই তাদের ছাপাখানা বন্ধ করে দেয় পুলিশ- এমনকি তাদের তিনজন কর্মীকেও গ্রেপ্তার করে।
রাজা মহিউদ্দিন আরো জানান, তাঁর ছাপাখানা থেকে পত্রিকার ৫০ হাজার কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
এনডিটিভি জানায়, জম্মু-কাশ্মীরের দশটি জেলায় এখনো কারফিউ চলছে। আটদিনেও কাটেনি অচলাবস্থা। হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানির জন্মস্থান ত্রাল এখনো বিক্ষুব্ধ। প্রতিদিনই সেখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে জনগণ। এ ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভ করছে স্থানীয় জনতা। এমন অবস্থায় দূর-দূরান্তের গ্রামেও কারফিউ জারি রয়েছে। বিচ্ছিন্ন রয়েছে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও।
শনিবারও পুলিশের গুলিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ক্যাবল টিভি সেবা ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকলেও পরে তা বাতিল করা হয়। তবে এখনো পর্যন্ত সংবাদপত্র প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু রয়েছে। কবে নাগাদ এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
এদিকে রাইজিং কাশ্মীরের সম্পাদক শুজাত বুখারি বলেন,‘কাশ্মীরের সংবাদপত্রের জন্য এটা একটা জরুরি অবস্থা। এই প্রথম দেশের সরকার এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই প্রথম আমরা সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারছি না। আমরা জানি না কখন এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।’
গত ৮ জুলাই অনন্তনাগের কোকেরনাগ এলাকায় সেনা ও পুলিশের বিশেষ বাহিনীর যৌথ অভিযানে হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানিসহ তিন হিজবুল যোদ্ধা নিহত হন। ওয়ানি নিহত হওয়ার পর থেকেই রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে জম্মু-কাশ্মীর। বিক্ষুব্ধ কাশ্মীরিদের দাবি, বুরহানকে ‘ভুয়া এনকাউন্টারে’ হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে পুলওয়ামা ও শ্রীনগরের কিছু অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিক্ষোভের মাত্রা বেড়ে গেলে কাশ্মীরের দশটি জেলা, এমনকি দূরবর্তী গ্রামেও কারফিউ জারি করা হয়।
জম্মু-কাশ্মীরে ক্রমে উত্তাল হতে থাকা এ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আফ্রিকা সফরে গিয়েছিলেন দোভাল। তবে কাশ্মীরের অশান্ত পরিস্থিতির কারণে সফর অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরে আসেন তিনি। দিল্লিতে নেমেই রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব রাজিম মহর্ষি এবং কেন্দ্রীয় ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোপ্রধান। বৈঠক শেষে অজিত দোভাল জানান, কাশ্মীরের সমস্যার খুব শিগগির সমাধান হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, কাশ্মীরে অশান্তির কারণে আফ্রিকা সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরেছেন নরেন্দ্র মোদি। কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে তিনি কয়েকদফা বৈঠক করলেও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
এফএফ





