উত্তর ইউরোপের নরডিক দেশগুলোর একটি হলো ফিনল্যান্ড। ফিনল্যান্ডের পশ্চিমে সুইডেন, পূর্বে রাশিয়া, উত্তরে নরওয়ে এবং দক্ষিণে রাশিয়া ও ফিনল্যান্ড উপসাগর। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে এ দেশের অবস্থান ৬৫তম। আর ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে অষ্টম। ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন কারণেই এ দেশটি বিখ্যাত। তবে সাধারণ বাংলাদেশী অনেকের কাছেই নকিয়ার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এ দেশ।
ফিনিস ভাষায় ফিনল্যান্ডকে বলা হয় ‘সুওমি’। ‘সুওমি’ শব্দের অর্থ ‘হ্রদ ও দ্বীপভূমির দেশ’। ফিনল্যান্ড হচ্ছে ‘হ্রদ’ আর ‘দ্বীপ’-এর দেশ। হ্রদের সংখ্যা ৬০ হাজার আর দ্বীপের সংখ্যা ৬ হাজার ৫০০। বেশিরভাগ এলাকা সমতল হলেও বেশ কিছু পাহাড়ও রয়েছে এদেশে। এদেশের আয়তন ৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ১শ ৪৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৫৩ লক্ষ ২ হাজার ৭শ ৭৮ জন (২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী)। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে দেশটি ১১১ নম্বরে রয়েছে। প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাত্র ১৬ জন লোকের বাস।
যেভাবে ফিনল্যান্ড জন্ম: ঐতিহাসিকভাবে এদেশের লোকেরা সপ্তম শতাব্দীতে রাশিয়ার ভোলগা নদীর অববাহিকা থেকে এ অঞ্চলে এসেছিল। এক সময় ফিনল্যান্ড ছিল সুইডেনের অংশ। সে কারণে এদেশে এখনও সুইডিশ ভাষা ও সংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৭ শতাংশ এখনও সুইডিশ বংশোদ্ভূত ও সুইডিশ ভাষায় কথা বলে। ১৮০৯ সাল থেকে ১৯১৭ সালের শেষভাগ পর্যন্ত ফিনল্যান্ড রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ফিনল্যান্ড নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। তাই দেশটির স্থাপত্যে রাশিয়ান প্রকৌশলের ছাপ সুস্পষ্ট।
সমৃদ্ধ সুন্দর দেশ: ফিনল্যান্ড খুবই সুন্দর সমৃদ্ধ দেশ। মাথাপিছু আয় ৩৪,৮১৯ মার্কিন ডলার। এদেশের জাতীয় আয় জনসংখ্যার চাইতেও দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে।
হাজারো হ্রদ আর দ্বীপে ভরা দেশ: ফিনল্যান্ড হচ্ছে হাজার ‘হ্রদ’ ও ‘দ্বীপ-এর দেশ। দেশজুড়ে ‘হ্রদ’ রয়েছে ৬০,০০০ আর ‘দ্বীপ’ রয়েছে ৬,৫০০। সবচেয়ে বড় হ্রদের নাম ‘সায়মা’। সায়মার আয়তন ৪,৪০০ বর্গকিলোমিটার। বেশিরভাগ হ্রদ-এর আয়তন ২৫ বর্গকিলোমিটারের বেশি নয়। ফিনল্যান্ডের বেশিরভাগ এলাকা সমতল হলেও সেখানে বেশ কিছু পাহাড়ও রয়েছে।
বড় হচ্ছে দেশ: বিশ্বের গুটি কয়েক দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ড হচ্ছে সেই দেশ যেখানে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ নিয়মিতভাবে বেড়ে চলেছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, বরফযুগের পরের সময় থেকে প্রতিনিয়ত ফিনল্যান্ডের উপরিভাগের বরফের স্তর হালকা হয়ে আসছে। এর ফলে জেগে উঠছে ভূভাগ। তাতে ফিনল্যান্ডের উপরিভাগ প্রতি বছর ৭ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি নির্ভর নয়: দেশের মোট জমির মধ্যে মাত্র ৭ ভাগ জমিতে চাষবাস হয়। দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল হচ্ছে বার্লি, যব এবং গম। এ ছাড়া সারাদেশে আলু ও সুগার বিট জন্মে। লোকেরা হাঁসমুরগি, গরুবাছুর, ভেড়া ও শূকর পালে। দেশে প্রায় ৪ লক্ষ ১৪ হাজার পোষা বলগা হরিণ রয়েছে। দেশের উত্তর অঞ্চলে যেখানে জনবসতি কম, সেখানে ভালুক, নেকড়ে, বনবিড়াল এবং মেরুশিয়াল দেখতে পাওয়া যায়।
দেশজুড়ে বন, বনকে ঘিরেই শিল্প: বনজ সম্পদ ফিনল্যান্ডের অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যে কোনো দেশেরই ২৫ ভাগ এলাকায় বনভূমি থাকা দরকার। সেখানে ফিনল্যান্ডের ৭২ শতাংশই হচ্ছে বনভূমি। এদেশের বনাঞ্চলে ১২শ প্রজাতির বৃক্ষ এবং লতাগুল্ম আছে। ফিনল্যান্ডের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ কাঠ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এদেশের বন এবং কাঠ চেরাই কারখানা সবচাইতে বিখ্যাত। কাঠের গুড়ি চালি বেঁধে নদীপথে ভাসিয়ে উপকূলীয় এলাকার করাতকল গুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়। 
কলকারখানায় নানাবিধ কাঠের পণ্য তৈরি করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এসব রপ্তানি সামগ্রীর মধ্যে আছে কাগজ, মন্ড, নিউজপ্রিন্ট, বোর্ড, প্লাইউড ইত্যাদি। এ থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের চল্লিশ শতাংশ আসে। এই রপ্তানি আয় দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজনীয় নানা পণ্য আমদানি করে। আমদানি পণ্যের মধ্যে আছে পেট্রোলিয়াম, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, লোহা, ইস্পাত, খাদ্য এবং বস্ত্রসামগ্রী।
সবাই লেখাপড়া জানে: ফিনল্যান্ড ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরা বিনামূল্যে শিক্ষা লাভ করে। প্রাথমিক স্কুলে ৬ বছর এবং মাধ্যমিক স্কুলে ৩ বছর লেখাপড়া করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। উচ্চশিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডে রয়েছে ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য কলেজ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুল। হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচাইতে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। ১৬৪০ খৃস্টাব্দে স্থাপিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৮২৮ খৃস্টাব্দে দেশের রাজধানী হেলসিংকিতে স্থানান্তরিত হয়।
স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণ: ফিনল্যান্ডে বেকার, অসুস্থ, অক্ষম এবং বৃদ্ধদেরকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। যুদ্ধাহতদের জন্য রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের যার যার কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি পৌর এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারদের কোন ফি দিতে হয় না।
লাইব্রেরি এবং জাদুঘর: ফিনল্যান্ডের মানুষ বই পড়তে খুব ভালবাসে। সারাদেশে দেড় হাজারেরও বেশি লাইব্রেরি রয়েছে। ১৮৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হেলসিংকি লাইব্রেরীতে প্রায় ২১ লক্ষ বই রয়েছে। হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী হচ্ছে জাতীয় লাইব্রেরী। এখানে বইয়ের সংখ্যা ২৬ লক্ষ। তাছাড়া ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি রয়েছে ফিনিসদের বেশ আগ্রহ। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দেশের নানা স্থানে।
রেডিও-টিভি-পত্রিকা: ফিনল্যান্ডে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে ৬৯৩টি টেলিভিশন এবং ১৬২৬টি রেডিও। প্রতিদিন ৫৫টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া নিয়মিতভাবে অসংখ্য সাময়িকী প্রকাশিত হয়।
এক নজরে ফিনল্যান্ড:
দেশটির সরকারি নাম: রিপাবলিক অব ফিনল্যান্ড
আয়তন: ৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ১শ' ৪৫ বর্গকিলোমিটার (১ লক্ষ ৩০ হাজার ৫শ' ৫৯ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা: ৫৩ লক্ষ ২ হাজার ৭শ' ৭৮ জন
রাজধানী: হেলসিংকি
ভাষা: ফিনিশ, সুইডিশ
শিক্ষার হার: ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মোট জনসংখ্যার ১০০% শিক্ষিত
সরকারপদ্ধতি: প্রজাতান্ত্রিক
রাষ্ট্রপ্রধান: প্রেসিডেন্ট
সরকারপ্রধান: প্রধানমন্ত্রী
মুদ্রা: ইউরো।
এআর





