ভারতের পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ে মেদির সস্তি মিলছে। কংগ্রেসের এমন অকল্পনিয় হার মেদিকে অভিভূত করেছে জনগন।

ডবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে জিততে চলেছেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কালীঘাটের বাড়ির বাইরে পা দেওয়ার আগেই তৃণমূলের নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানানোর খবরটি নরেন্দ্র মোদি নিজেই টুইট করে জানান। বোঝাই যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের বঙ্গ বিজয়ের খবর প্রধানমন্ত্রীকে কতটা আশ্বস্ত করেছে। আগামী তিন বছর দেশ শাসনের ক্ষেত্রে মমতার দ্বিতীয় ইনিংস তাঁর কাছে এতটাই কাম্য ও প্রার্থিত।

আসামে বিজেপি যে এই প্রথম ক্ষমতায় আসতে চলেছে, সেই ইঙ্গিত শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু সেই জয়ও যে এমন নিরঙ্কুশ হবে, মোদি অথবা তাঁর দক্ষিণ হস্ত অমিত শাহ হয়তো তা আন্দাজ করেননি। সেই নিরিখে টিম মোদির উদ্বেলিত হওয়ার কারণও রয়েছে। কিন্তু তাঁর সেই আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে মমতার অবিশ্বাস্য জয়। কেননা, প্রবল প্রতিপক্ষ কংগ্রেস ও তার নয়া দোসর বামপন্থীদের কোনো রকম উত্থান আর যা-ই হোক রাজনৈতিক দিক থেকে বিজেপির কাম্য হতে পারে না। তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস সব সময়ই বিজেপির স্বাভাবিক মিত্র। সেই মিত্রের এমনভাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোকে কুর্নিশ জানাতে মোদি তাই দেরি করেননি।

ভোটের এই ফলে বিজেপি শুধু আসাম নিয়েই খুশি নয়, পশ্চিমবঙ্গেও তারা তাদের ভোটের ভাগ কিছুটা ধরে রেখে বিধানসভায় আসন বাড়াতে পেরেছে। পাশাপাশি, কেরালায় তারা এই প্রথমবার খাতা খুলেছে। তামিলনাড়ুতে জয়ললিতার জয়েও মোদি স্বস্তিতে। এর কারণ প্রথমত, জয়ললিতার সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক ভালো, দ্বিতীয়ত, রাজ্যে ডিএমকে-কংগ্রেস জোট পরাস্ত। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি পেয়েছিল ১৭.২ শতাংশ ভোট ও দুটি আসন। ভোট-পণ্ডিতদের ধারণা ছিল, বিজেপির সেই প্রাপ্য ভোট এবার অর্ধেকেরও বেশি কমে যাবে। দেখা যাচ্ছে, বিজেপির ভোট কমেছে ৭ শতাংশের মতো। বিস্ময়ের কথা এই, লোকসভা ভেটের তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটও বেড়েছে ৭ শতাংশ। একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এই যে, বিজেপির ভোট বেশ কিছু কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে। কংগ্রেস ও বামপন্থীদের কাছে যা ‘মোদি-দিদি আঁতাত’।

মোদি ও দিদির মধ্যে এই বোঝাপড়া বাংলাদেশের পক্ষে সুখবর বয়ে আনতে পারে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে যে দীর্ঘ টালবাহানা, অতঃপর তার অবসান ঘটবে বলেই ধারণা। উত্তরবঙ্গের ভোটে এবারেও তিস্তা একটা ইস্যু ছিল। মমতা কখনো চাননি ভোটের আগে এই বিষয়ে এগোতে। মোদির সঙ্গে বাংলাদেশে গিয়ে তিনি বলেছিলেন তাঁর ওপর ভরসা রাখতে। উত্তরবঙ্গ নিয়ে মমতা কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু ভোটের ফল তাঁর সেই দুশ্চিন্তা দূর করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের কৃষি সেচ ব্যবস্থা যতটা মার খেতে পারে তা পুষিয়ে দিতে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় প্রকল্প এবার তিনি আবাহন করতেই পারেন। নিভৃত আলোচনায় বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের তিনি বারবার ভোট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেছেন। সেই অপেক্ষায় এখন মেওয়া ফলার সম্ভাবনা।

তবে আসামে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে কি না, তা দেখার। বিজেপি এবার যে দুই দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভোটটা লড়ল, তাদের একটা হলো অসম গণপরিষদ (অগপ), অন্যটা বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট (বিপিএফ)। বিজেপির মতোই দুই দলই আশাতীত সাফল্য পেয়েছে। অগপ-র রাজনৈতিক উত্থান ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারা বরাবর তাদের রাজনীতিতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরোধিতা করে এসেছে। স্থলসীমান্ত চুক্তিরও তারা ছিল ঘোরবিরোধী। বিরোধিতা করেছিলেন আসামের বিজেপি নেতৃত্বও। ক্ষমতায় এসে এই দুই দল সেই পুরোনো ইস্যু খুঁচিয়ে তুললে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। অনুপ্রবেশকারীদের ‘কাট অব ইয়ার’ নির্দিষ্ট করে তাদের শনাক্ত, চিহ্নিতকরণ ও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে নতুন সরকার নতুনভাবে উদ্যোগী হলে আসামের পরিস্থিতিও জটিল হতে পারে।

আসামে এবারের ভোটে সংখ্যালঘুদের সমর্থনের নজির উল্লেখযোগ্য। ফলের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অসমিয়া মুসলমানদের একটা বড় অংশ এবার কংগ্রেসকে ত্যাগ করে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সুপ্ত রেষোরেষি নয়া জমানায় কোন রূপ নেয়, তা দেখার।

এই ভোটে সবচেয়ে খারাপ হাল কংগ্রেসের। দলটা আসাম ও কেরলের মতো দুটি রাজ্য হারাল শুধু নয়, পশ্চিমবঙ্গেও বামপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বেইজ্জতও হলো। মোদির ‘কংগ্রেস-মুক্ত ভারত’ গড়ার ডাক কার্যত সফল হতে চলেছে।

এর ফলে কংগ্রেসের এই ভরাডুবির ফলে ‘প্রিয়াঙ্কা লাও দল বাঁচাও’ দাবি আরও জোরালো হতে পারে। ইতিমধ্যেই বিক্ষিপ্তভাবে কেউ কেউ সেই দাবি তুলতে শুরু করেছেন। দাবি জোরালো হলে সোনিয়ার পক্ষে কন্যাকে আমেঠি ও রায়বেরিলির গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখাও এখন কঠিন হবে। তেমনই কঠিন হতে পারে দুর্নীতির অভিযোগের সামাল দেওয়া। অগস্তা ওয়েস্টল্যান্ড হেলিকপ্টার কেনা-বেচা চুক্তি নিয়ে ঘুষের যে অভিযোগের তির কংগ্রেসের তাবড় নেতাদের দিকে ধাবিত, শাসক দল তার গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি তাঁর এই ব্যক্তিগত তাগিদ নিয়ে কোনো লুকোছাপা এখনো পর্যন্ত করেননি।

পশ্চিমবঙ্গের ভরাডুবির সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমে শুরু হয়ে গেছে ‘বেঙ্গল ও কেরল’ লবির আকচা-আকচি। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিষয়টি আবার নতুন করে উঠবে। বৃহস্পতিবারই বেঙ্গল লবির ঘোরবিরোধী প্রকাশ কারাতের স্ত্রী বৃন্দা বলে দিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধা ঠিক হয়েছিল কি না, তা নতুনভাবে বিচার করা দরকার। বামফ্রন্টের অসন্তুষ্ট অন্য শরিকেরাও এবার জোট-বিরোধিতায় সরব হবে। জোটবিরোধীদের মতে, এতে জাতও গেল, পেটও ভরল না। সন্দেহ নেই, পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফল সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদিকে যতখানি স্বস্তি দিয়েছে, ততটাই অগোছালো করে তুলেছে কংগ্রেস ও সিপিএমকে।

সর্বশেষ বেসরকারি ফলাফল:

পশ্চিমবঙ্গ মোট ২৯৪

দল জয়ী

তৃণমূল কংগ্রেস ২১১

বাম–কংগ্রেস জোট ৭৬

বিজেপি ০৩

আসামের ফলাফল:

আসাম মোট ১২৬

দল জয়ী

বিজেপি জোট ৮৬

কংগ্রেস ২৪

এইআইইউডিএফ ১৩

এআই