ভারতজুড়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম। গুজরাটের ভারুচে বিজেপির দুই নেতাকে খুনের ঘটনা এবং গোটা দেশে দাঙ্গা তৈরি করার প্ল্যান ফাঁস হয়েছিল ৭ জনকে গ্রেফতার করার পর।
শনিবার (৪জুন ২০১৬) আহমেদাবাদের আদালতে দাউদ ঘনিষ্ঠ ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করেছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি। এই ১০ জনের মধ্যে অন্যতম দুই চক্রান্তকারী হল জাভেদ চিকনা এবং জাহিদ মিঞা।
ভারুচের এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় গুজরাটের সন্ত্রাস দমন শাখা উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর থেকে গ্রেফতার করেছিল অবিদ দাউদ প্যাটেলকে। এই আবিদ দাউদ ইব্রাহিমের অন্যতম ঘনিষ্ঠ জাভেদ চিকনার ভাই। এনআইএ এই চার্জশিট দেওয়ার পাশাপাশি ইন্টারপোলকে চিঠি লিখে বলেছে পাকিস্তানে থাকা জাভেদ চিকনাকে চিহ্নিত করে তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানকে চাপ দেওয়া হোক।
২০১৫ সালের নভেম্বরে ভারুচের বিজেপি নেতা শিরিষ বাঙ্গালি এবং প্রাজ্ঞেশ মিস্ত্রি খুন হন। কিন্তু তদন্তে নামার পর এনআইএ জানতে পারে ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির একটি চক্রান্ত হয়। দাউদ ইব্রাহিম যে প্ল্যানটি করেছিল তা হল একদিকে হিন্দুত্ববাদী নেতাদের হত্যা করা এবং আরএসএস দপ্তরগুলিতে আক্রমণ। আবার অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্পর্শকাতর জায়গাগুলিতে গির্জার ওপর হামলা করা।

জাভেদ চিকনার নাম আসার সঙ্গে সঙ্গে দাউদের বৃহত্তর প্ল্যান নিয়ে আবার উদ্বেগ মাথাচাড়া দিয়েছে ভারতের নিরাপত্তা এজেন্সির। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এখন আর ছোটা রাজনের অস্ট্রেলিয়া কিংবা মালয়েশিয়ায় নেটওয়ার্ক নেই। সে এখন তিহার জেলে। যতদিন ছোটা রাজন বাইরে ছিল ততদিন সে ভারতীয় গোয়েন্দাদের নানাবিধ খবর সরবরাহ করেছে। কিন্তু এখন আর সেই সোর্স নেই। সুতরাং ডি কোম্পানির প্রকৃত গতিপ্রকৃতি এখন আর আগের মতো জানা যায় না।
কিছুদিন আগেই দাউদের পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়েছে এবং করাচির লিয়াকত আলি হাসপাতালের ডাক্তাররা নাকি বলেছে তার পা কেটে বাদ দিতে হবে বলে গুজব ছড়ায়। এখনও পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি সেই খবরটি আদৌ সত্যি নাকি পুরোটাই গুজব।
যে জাভেদ চিকনার ভাই গুজরাটের এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিল সে সরাসরি দাদা জাভেদের থেকেই যে এই কন্ট্রাক্ট পেয়েছিল তা স্বীকারও করেছে এনআইএর কাছে। দুবাইতে ১৯৯৩ সালে ইয়াকুব মেমন, টাইগার মেমনদের সঙ্গে মুম্বাই ছেড়ে চলে গিয়েছিল এই জাভেদ। ১৯৯২ সালের মোম্বই দাঙ্গায় তার পরিবার আক্রান্ত হয় এবং তারও পায়ে গুলি লাগে।
দাউদ ইব্রাহিম ১৯৯২ সালের সেই দাঙ্গার বদলা নিতেই টাইগার মেমনকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৩ সালে ১২ মার্চ মুম্বইয়ে সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণের চক্রান্ত করেছিল। আর সেই বিস্ফোরণের অন্যতম প্রধান পান্ডা ছিল জাভেদ চিকনা।

এদিকে, ইন্টেলিজেন্স সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় বাংলা সংবাদপত্র সংবাদ প্রতিদিন জানিয়েছে, দিল্লি রেলস্টেশন, মেট্রোরেল, আইজিআই এয়ারপোর্ট, সংসদ ভবনকে টার্গেট করেছে তার ‘ডি’ কোম্পানি।
সম্প্রতি পুনের এক বেআইনি অস্ত্র ব্যবসায়ীকে জেরায় বেরিয়ে এসেছে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর চাপে নাকি ভারতে হামলার ছক কষছে দাউদ৷ পত্রিকাটির দাবি, এই অস্ত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে দাউদের পরিচয় বহু পুরনো।
এদিকে, এই ভয়াবহ পরিকল্পনার কথা প্রথমে জানতে পারে দিল্লির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলার থানা। এরপর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো।
এতদিন পর্যন্ত এই দাউদ ইব্রাহিমের হামলা করার প্রধান জায়গা ছিল মুম্বাই। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ব্লাস্ট-কাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত দাউদ ইব্রাহিম বরাবরই টার্গেট করেছে দেশের বাণিজ্য নগরীকে। কিন্তু এবারই পরিকল্পনা বদলে দিল্লিকে আক্রমণের ছক কষেছে দাউদ।
একনজরে দাউদ ইব্রাহিম
দাউদ ইব্রাহিম কাসকার, (জন্মঃ ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৫) দাউদ ইব্রাহিম নামেই বেশি পরিচিত যিনি ভারতের মুম্বাই এর সংগঠিত অপরাধ চক্রের প্রধান। তার সিন্ডিকেটের নাম হলো ডি কম্পানি। তিনি সংগঠিত অপরাধের জন্য ইনাটারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় এবং মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস-এর বিশ্বের শীর্ষ পলাতক অপরাধীদের ২০১১ এর তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন।
দাউদ ইব্রাহিম ২০০৮ সালেও ফোর্বস-এর তালিকায় চতুর্থ স্থানে ছিলেন। এছাড়া ভারতীয় পুলিশের পলাতক অপরাধীদের তালিকায়ও তার নাম শীর্ষে।
দাউদ ইব্রাহিমের দলে প্রায় ৫ হাজার সদস্য রয়েছে যারা মাদক চোরাচালান থেকে শুরু করে খুন, অপহরন এর মত কাজ করে থাকে। ছোটা শাকিলকে দাউদ ইব্রাহিম এর ডান হাত হিসেবে ধরা হয়। তাদের কর্মক্ষেত্র ভারত, পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব অমিরাত।
১৯৯৩ সালে ১২ মার্চ মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে এক সিরিজ বোমা বিস্ফোরণে ৩১৫ জন (সরকারি হিসেবে ২৫৭ জন) লোক নিহত হয়। এর জন্যও দাউদ ইব্রাহিমকে অভিযুক্ত করা হয়। ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ইন্ডিয়ান সুপ্রীম কোর্ট এক নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারে এই বোমা হামলায় দাউদ ইব্রাহিম সরাসরি জড়িত এবং বর্তমানে এই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন পাকিস্তানে আত্মোগোপন করে আছেন। তবে পাকিস্তান সরকার ভারতের এই দাবি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এসএম/কেবি





