আগাম ভোটে ভোটারদের অংশগ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন এবং নির্বাচনী প্রচারণার গতিপ্রকৃতি এবারের ভোটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে আগাম ভোটের সংখ্যা বেশি হলেই কোনো দল এগিয়ে রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি, আসনভিত্তিক ফলাফল ও স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণই নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পর্যন্ত দেশজুড়ে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি আগাম ও ডাকযোগে ভোট জমা পড়েছে। ২০২২ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ লাখ। আগাম ভোটের সুযোগ বৃদ্ধি এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণেও এ সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে। ফলে শুধু আগাম ভোটের পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো দলের নির্বাচনী সাফল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মূল আকর্ষণ কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সীমিত। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের ফলাফলই কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুনরুদ্ধার ডেমোক্র্যাটদের জন্য তুলনামূলক কঠিন। রয়টার্সের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়াতে হবে। মিশিগান ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের দখলে থাকা কয়েকটি আসনে জয় পাওয়াও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ডেমোক্র্যাটদের সামনে দুটি পৃথক চ্যালেঞ্জ রয়েছে—প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং সিনেটে আসন বাড়িয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে আনা। উভয় ক্ষেত্রেই ফলাফল নির্ভর করবে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটারদের অংশগ্রহণের ওপর।
অক্টোবরের বিভিন্ন জাতীয় জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন রিপাবলিকানদের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ১২ শতাংশ পয়েন্ট বেশি দেখা গেছে। সিএনবিসি, ইকোনমিস্ট/ইউগভ, রয়টার্স/ইপসোস, সিএনএন/এসএসআরএস, নিউইয়র্ক টাইমস/সিয়েনা, ইচেলন ইনসাইটস, রাসমুসেন রিপোর্টস ও ফক্স নিউজের জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
এই জরিপগুলো প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে দলটির সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা বাড়িয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ভোটে এগিয়ে থাকা মানেই প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়া নয়। ৪৩৫টি আসনের স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটার উপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকার ফলাফলই এ ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রাখবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণের হিসাবও আলাদা, কারণ সেখানে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের নির্বাচনে অর্থনীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানির ব্যয় ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে কংগ্রেস নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছেন।
মূল্যস্ফীতি ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা এসব বিষয় সামনে রেখে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রভাব সব অঙ্গরাজ্য ও নির্বাচনী এলাকায় এক রকম হবে না। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সমস্যা এবং দলীয় প্রচারণাও ফলাফলে ভূমিকা রাখবে।
টেক্সাস, কানসাস, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যে ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় আগাম ভোটের সংখ্যা বেড়েছে। এপির বিশ্লেষণে টেক্সাসে আগাম ভোটের সংখ্যা ৭৪ শতাংশ এবং কানসাসে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা ও ওহাইওতেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। এসব অঙ্গরাজ্যের কয়েকটিতে সিনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন রয়েছে।
তবে সব অঙ্গরাজ্যে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। মিশিগান ও জর্জিয়ায় আগাম ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও ২০২২ সালের তুলনায় তা কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। আইওয়ায় আবার আগাম ভোটের সংখ্যা আগের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একই সময়ের তুলনায় কম। অর্থাৎ ভোটারদের অংশগ্রহণের চিত্র অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন।
নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত আগাম ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিউ জার্সিতেও একই সময়সীমায় আগাম ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। উভয় অঙ্গরাজ্যেই মূল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩ নভেম্বর।
আগাম ভোটের সুযোগ ভোটারদের সুবিধা বাড়ালেও এ ভোটের পরিসংখ্যান থেকে চূড়ান্ত ফলাফল অনুমান করা কঠিন। কোন দলের সমর্থকেরা আগাম ভোট দিচ্ছেন, কারা নির্বাচনের দিন ভোট দেবেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ভোটের ব্যবধান কত হবে—এসব বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
আগাম ভোটের বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সীমিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। তবে সিনেটের আসনবিন্যাস, স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণ এবং ভোটারদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত উভয় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না কিংবা সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। জাতীয় জরিপে কোনো দলের সমর্থন বেশি থাকা কিংবা আগাম ভোটের সংখ্যা বৃদ্ধি—কোনোটিই এককভাবে বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না।
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফল এবং ভোট গণনার পরই স্পষ্ট হবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পরবর্তী রাজনৈতিক পথচলা এবং আগামী দিনের আইন প্রণয়নেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এস
















