রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে আবারো অভিযানে নেমেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গত ১০ অক্টোবর শুরু হওয়া ‘কিয়ারেন্স অপারেশন’ নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে। গত বুধবার সকাল থেকে আরাকান রাজ্যের মংডু এলাকার সানচি প্রাং (হাতি পাড়া) এলাকায় হেলিকপ্টার টহল শুরু হয়।

আকাশ থেকে জনবসতি লক্ষ্য করে মেশিনগানের গুলি ছোড়া হয়। এরপর থেকেই গ্রামটির চার দিকে সৈন্য সমাবেশ বাড়তে থাকে। বর্তমানে সাঁজোয়া বাহিনী গ্রামটিকে ঘিরে রেখেছে। থেমে থেমে চালানো হচ্ছে মর্টার শেল হামলা।

সেনাসদস্যরা চাচ্ছে গ্রামের বাসিন্দারা ভীতসন্ত্রস্ত্র নাফ নদী পথে পালিয়ে যাক।
একই অবস্থা মংডুর ২২টি গ্রামে। দেড় মাস ধরে এসব গ্রামকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী।

গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার, শুক্র ও শনিবার সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় গ্রামগুলোর অসংখ্য রোহিঙ্গা হতাহত হয়। সেনাসদস্যরা বহু রোহিঙ্গার লাশ মাটি চাপা দিয়েছে। এখনো গ্রামের আশপাশে ধানক্ষেত ও জঙ্গলে অনেক নারী-পুরুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ দিকে গণহত্যার নৃশংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া মুসলিম নারীরা শিকার হয়েছেন গণধর্ষণের।

যারা নৌপথে পালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা আশ্রয় নিয়েছেন জঙ্গল ও পাহাড়ের পাদদেশে। যেসব পুরুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তারা কেউ আর ফিরে আসেনি। তুলে নেয়া নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হচ্ছে।

অনেক রোহিঙ্গা নারীর বেওয়ারিশ লাশ উত্তর মংডুর বিভিন্ন গ্রামে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ সদস্যরা মাটি চাপা দিচ্ছে। এ ছাড়া গত সপ্তাহে অভিযানে নিহত ১০ জনের লাশ গতকাল সকালে মাটি চাপা দিয়েছে সেনাবাহিনী।

অনেকে রাতের আঁধারে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। কিন্তু এখানেও তাদের নিরাপত্তা নেই। ওপারে নাফ নদীতে ওঁৎপেতে থাকা মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলে একটি রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা ডুবে যায়।

তবে নৌকারোহীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে জানা যায়নি। ডুবে যাওয়াদের মধ্যে বেশির ভাগ ছিল নারী ও শিশু। অপর রোহিঙ্গা বোঝাই দুইটি নৌকাকে ধাওয়া করে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের ব্যাপক জিঙ্গাসাবাদ করে নাগপুরা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে হস্তান্তর করে। মিয়ানমার ক্যাম্পে নারীদের চোখ বেঁধে বিবস্ত্র করে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।

এরপর পুরুষের সামনেই চলে পাশবিক নির্যাতন। হাত বাঁধা অনেক পুরুষ এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করলে সাথে সাথেই তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।

পালিয়ে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গার মুখে এহেন বীভৎস বর্ণনা শুনে শ্রোতাদের কেউ স্থির থাকতে পারেননি।

নাগপুরা থেকে পালিয়ে আসা আবদুল গফুর (৪০) জানান, ৩ দিন ধরে নাগপুরার ক্যাম্পের সেনাবাহিনীর সদস্যরা সীমান্তে ঢেকিবনিয়া, কুমিরখালী, শিলখালী, বলিবাজার ও নাগপুরাসহ পাঁচটি গ্রামে তা-ব চালাচ্ছে। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। সৈন্যদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে দুর্গম এলাকাগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন বাসিন্দারা।

খাদ্য সঙ্কটের পাশাপাশি তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে প্রচন্ড- শীত।
এ দিকে নাফ নদী দিয়ে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) স্থল ভাগে পাহারার পাশাপাশি কোস্টগার্ড নদীতে স্পিডবোট নিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

অপর দিকে বাংলাদেশের নৌসীমায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের দায়ে এক বছর কারাভোগের পর মিয়ানমারের ৯১ জন নাগরিককে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।

গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় ঘুমধুম ঢেঁকিবনিয়া বিজিপি ক্যাম্পে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব মিয়ানমার নাগরিককে হস্তান্তর করা হয়।

মিযানমারের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ বাতিল করেছে মালয়েশিয়া মিযানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে দেশটির অনূর্ধ্ব-২২ দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য দুটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করেছে মালয়েশিয়া।

মালয়েশিয়া ফুটবল দলের এক মুখপাত্র গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়ে বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্যাতনকে কেন্দ্র করে প্রীতি ম্যাচ বাতিলের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

নাম প্রকাশ না করে ওই মুখপাত্র আরো বলেন, মালয়শিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের প্রতি মালয়েশিয়ার বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করছে এবং তাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে আভিযোগ আছে।

এদিকে গত বুধবার মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের পক্ষ থেকে এক টুইট বার্তায় জানানো হয়, আগামী ৯ ও ১২ ডিসেম্বর মিয়ানমারের অনূর্ধ্ব-২২ দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য দুটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি মিযানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। এই অভিযানে রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যা, মহিলা ও কিশোরীদের ধর্ষণ, তাদের বাডঘিরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।

মাহমুদ.