আগস্টের শুরুতে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর বিজয় ভাষণে নিজের অভিবাসী পরিবারের গল্প তুলে ধরেন এল সাইদ।
তিনি বলেন, ‘আমার কাজিনদের মতো আমারও মিশরে ট্যাক্সি ক্যাব চালক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের দুর্ঘটনায় আমার বাবা ডেট্রয়েটে অভিবাসী হয়ে আসেন এবং আমি আমেরিকান হিসেবে পরিচিতি পাই।’
মিশরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান ও মুসলিম রাজনীতিক হওয়ার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছেন এল সাইদ। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা এই রাজনীতিক স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সহজলভ্য করা, রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো এবং বিদেশি সামরিক বাহিনীতে মার্কিন অর্থায়ন বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তার নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম স্লোগান ছিল—‘মানি আউট অব পলিটিক্স, মানি ইন ইওর পকেট, হেলথকেয়ার ফর অল’। অর্থাৎ রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব সরিয়ে মানুষের হাতে অর্থ ফেরত দেওয়া এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তারও বিরোধিতা করে আসছেন এল সাইদ। তার ভাষায়, ইসরাইলের সেনাবাহিনীকে অর্থ সহায়তা দেওয়া ‘আমাদের ট্যাক্স ডলারের নিকৃষ্টতম ব্যবহার’।
ইসরাইলসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের সেনাবাহিনীতে মার্কিন অর্থায়নের বিরোধিতা তার রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে তিনি ট্রাম্পবিরোধী ভোটারদেরও আকৃষ্ট করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে তার এই অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন পাওয়ার পর এল সাইদকে ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘এই ব্যক্তি ইহুদিদের ভালোবাসে না, সে ইসরাইলকে ভালোবাসে না, সে তাদের ঘৃণা করে।’
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার পথটিও সহজ ছিল না এল সাইদের জন্য। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় ধরনের সমর্থন ছাড়াই মনোনয়ন নিশ্চিত করায় তাকে ‘আউটসাইডার’ বা বহিরাগত রাজনীতিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী প্রগতিশীল নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেক্সান্দ্রিয়া ওসারিও-কর্টেজের মতো ব্যক্তিরা।
এল সাইদের সমর্থনের অন্যতম ভিত্তি শ্রমজীবী মানুষ, স্বাস্থ্যসেবা ও করপোরেটবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান। এসব ইস্যুতে তার অবস্থান মিশিগানের একটি বড় অংশের ভোটারের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মূলধারার রাজনীতিতে এল সাইদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ওই বছর মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে তিনি পরাজিত হলেও ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন।
সেই নির্বাচনেও তার প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো।
এর আগে ২০১৭ সালে গভর্নর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ডেট্রয়েটের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
এল সাইদের রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে বেশ আলোচিত ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে ডেট্রয়েটের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালক হন। যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোনো শহরের এমন পদে দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন তিনি।
দায়িত্ব পালনকালে শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা দেওয়া এবং শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেন তিনি।
এসব কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম কমিউনিটির মধ্যেও তার ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়।
এল সাইদের রাজনীতিতে আসার পেছনে ২০০৭ সালের একটি ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। ওই বছর মিশিগান ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এল সাইদ। তার বক্তব্যের প্রশংসা করেন ক্লিনটন এবং পরে আলাদাভাবে তার সঙ্গে দেখা করেও প্রশংসা করেন তিনি।
এর প্রায় এক দশক পর রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন এল সাইদ।
এবার মিশিগানের সিনেটর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন আবদুল এল সাইদ। রজার্সকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নভেম্বরের নির্বাচনে জয় পেলে শুধু মিশিগান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ হবে। তিনিই হবেন দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর।
অভিবাসী পরিবারের সন্তান থেকে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সেখান থেকে গভর্নর প্রার্থী এবং এখন সিনেটর পদপ্রার্থী—এল সাইদের রাজনৈতিক যাত্রা তাই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এস