একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমার সরকার ও রাখাইনে সক্রিয় আরাকান আর্মির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মোর সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর বিকেল পৌনে ৬টায় সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে ঢাকার অবস্থান
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করার সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়। তাদের নিজস্ব পরিচয় রয়েছে এবং প্রত্যাবাসনের সময় সেই পরিচয়কেই স্বীকৃতি দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সেটার সঙ্গে আমরা একমত নই। তাদের নিজেদের একটা আইডেনটিটি আছে, সেই আইডেনটিটি নিয়েই তারা ফেরত যাবে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকটি ভালো পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রদূত বিষয়গুলো তার সরকারের কাছে তুলে ধরে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা
মঙ্গলবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, তাদের পরিচয় এবং প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকের পর শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। কারণ বাংলাদেশ চায় যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে।
তিনি বলেন, শুধু আলোচনার মাধ্যমে নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার মাধ্যমেও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক চাপের পক্ষে ঢাকা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন বলে আবারও বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে রাখাইনে প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির ওপরও চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির ওপরও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশ সবসময় বলে আসছে। বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনাতেও বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার সরকারের ওপর আস্থা রাখতে চায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন মিয়ানমারের ওপর আরও কার্যকর চাপ সৃষ্টি করে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ কাজ করছে।
চীনের সহযোগিতার আশ্বাস
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের সময় চীনা সরকারের পক্ষ থেকেও মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
শামা ওবায়েদের ভাষ্য, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ রয়েছে এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় তারা প্রভাব কাজে লাগাবে বলে বাংলাদেশ আশা করছে।
২০১৭ সালে মানবিক কারণে আশ্রয়
বাংলাদেশ কেন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেটিও সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানবতা ও মানবাধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল।
২০১৭ সালের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় শরণার্থীশিবিরে তাদের অবস্থান। দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়ে আসছে ঢাকা।
কেন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ নয়?
মিয়ানমারের শনিবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে নয়, বরং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। এ বক্তব্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কেন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেনি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নেরও জবাব দেন শামা ওবায়েদ।
তিনি বলেন, প্রতিটি বিষয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে প্রতিবাদ করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, বিষয়টি এমন নয়। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেও অনেক বিষয় সমাধানের চেষ্টা করা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন—এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। তবে একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগও চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু ঘোষণা দিয়ে প্রতিবাদ করলে সমাধান আসবে—বিষয়টা এমন নয়।’
প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় ঢাকা
বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এ জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় করছে। কারণ ঢাকা চায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবে শুরু হোক।
তবে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, রোহিঙ্গাদের পরিচয়, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বাংলাদেশ। নিজস্ব পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদ পরিবেশে নিজ দেশে ফিরতে পারে, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ এখন একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীনসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সহযোগিতাও চাওয়া হচ্ছে।
ঢাকার প্রত্যাশা, মিয়ানমার সরকার দ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রত্যাবাসনের বাস্তব উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে রাখাইনের পরিস্থিতি উন্নত এবং প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মঙ্গলবারের বৈঠক ও পরবর্তী ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে—রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় এবং তাদের নিজস্ব পরিচয় স্বীকার করেই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপও অব্যাহত রাখবে ঢাকা।
এমএম