মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ক্রুসহ ২৩৯ জন যাত্রী নিয়ে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনার দুদিন পেরিয়ে গেলেও বিমানের কোন হদিস করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। বিশ্বের ইতিহাসে এ রকম কয়েকটি রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে আমাদের আজকের এই আয়োজন তুলে ধরা হল টাইম নিউজের পাঠকদের জন্য।
এক. মার্কিন নারী বৈমানিক অ্যামিলিয়া ইয়ারহার্টের নিখোঁজ রহস্য আজো উদঘাটিত হয়নি। ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে। ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরে বিমান নিয়ে হারিয়ে যান অ্যামিলিয়া। উল্লেখ্য, অ্যামিলিয়া আরেক নভোচারী ফ্রেড নূনানের সঙ্গে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
অ্যামিলিয়াই হলেন প্রথম নারী যিনি একাকী বিমান নিয়ে আটলান্টিকের উপর দিয়ে উড়ে যান।
তার হারিয়ে যাওয়া নিয়ে বিভিন্ন কথা শোনা যায়। গবেষকরা এ ব্যাপারে এখনো অন্ধকারে রয়েছেন। তবে, সাধারণত ধারণা করা হয়, প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে উড়ার সময় তার বিমানের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় তা সাগরে বিধ্বস্ত হয়। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের ব্যক্তিগত গোয়েন্দা এবং তিনি তখনকার শত্রুদেশ জাপানের হাতে ধরা পড়েন।
আবার অনেকেই মনে করেন যে, অ্যামিলিয়ার বিমানটি প্রশান্ত মহাসাগরে একটি জাপানি দ্বীপের নিকট বিধ্বস্ত হয়। সেখানেই দ্বীপের বালির মধ্যে তিনি চাপা পড়েন, পরবর্তীতে তার মরদেহ সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এর কোন সত্যতা নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন, অ্যামিলিয়ার কিছুই হয়নি; বরং তিনি নিরাপদে নিউজার্সিতে ফিরে আসেন এবং পরবর্তী জীবনে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে ফেলেন, ফলে তাকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। আবার অনেকেরই ধারণা, অ্যামিলিয়াকে ভিনগ্রহের বাসিন্দারা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তার এ রহস্যজনক অন্তর্ধান নিয়ে ১৯৯৫ সালে 'স্টার ট্রেক: ভয়েজার' নামে একটি গোয়েন্দা কাহিনী লেখা হয়।
দুই. ব্রিটিশ বৈমানিক গ্লেন মিলারের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ইতিহাসে একটি রহস্যজনক ঘটনা। ১৯৪৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড থেকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে উড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার সময় তিনি বিমান নিয়ে নিখোঁজ হন। কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এই সময়ে শত্রুদেশ জার্মানির আক্রমণে বিধ্বস্ত হয় মিলারের বিমান। তবে, ফ্রান্সের একজন সাংবাদিক দাবি করেছেন, মিলার ঠিকঠাক মতোই প্যারসে পৌঁছেন এবং প্যারিসের পতিতালয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।
তিন. ১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ঘটে সবচেয়ে রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনা। এদিন রহস্যময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে একই সাথে পাঁচটি প্রশিক্ষণ বিমান হারিয়ে যায়। এমনকি ওই পাঁচটি বিমানের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা সরেজমিনে দেখতে যাওয়া আরেকটি বিমানও আর ফিরে আসেনি। এর রহস্য আজো উদঘাটিত হয়নি। বিমানগুলো ফ্লোরিডা উপকূল থেকে আটলান্টিকের উপর দিয়ে উড়ছিল। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ারও কোন যৌক্তিকতা নেই। কেননা বিমানগুলো মাত্র দেড় ঘণ্টার মতো উড়েছিল।
বৈমানিকসহ ১৪ জন ক্রুয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। তারা অভিজ্ঞ ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর চার্লস টেইলরের অধীনে ওই প্রশিক্ষণে ছিলেন। টেইলর জানান, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এলাকায় ওই পাঁচটি বিমান যাওয়ার পর তার রেডিও ট্রান্সমিশন বা নেভিগেশন কন্ট্রোলার কাজ করছিল না।  
চার. ১৯৪৭ সালের ২ আগস্ট আর্জেন্টিনায় ঘটে আরেকটি রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনা। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স থেকে একটি বিমান চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোতে উড়ে যাচ্ছিল। ব্রিটিশ সাউথ আমেরিকান এয়ারওয়েজের বিমানটি আন্দিজ পর্বতের উপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় নিখোঁজ হয়। বিমানটির নিখোঁজ হওয়ার কোন কারণ উদঘাটন হয়নি আজ পর্যন্ত। এমনকি প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত বিমানটির ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ৫০ বছর পর দুই পর্বতারোহী আন্দিজ পর্বত জয় করতে গিয়ে বিমানটির ধ্বংসাবশেষ ও যাত্রীদের ছিন্ন-ভিন্ন কাপড় দেখতে পান। ধারণা করা হয়, বিমানটিতে কূটনৈতিক কাগজপত্র বহন করছিল এক যাত্রী। এগুলো ধ্বংস করার জন্যই বিমানটিকে ধ্বংস করা হয়।
পাঁচ: ১৯৪৮ এ আবারও ব্রিটিশ সাউথ এয়ারওয়েজ এর “স্টার টাইগার” বিমানটি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের উপর থেকে হারিয়ে যায়। বিমানটি খুবই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে যাত্রা শুরু করে। এতো ধীরে যাওয়ার কারনে জ্বালানী ফুরিয়ে যেতে থাকে। এক সময় বারমুডার উপর অপর্যাপ্ত জ্বালানীর কারণে এটা বিধ্বস্ত হয়।
ছয়:১৯৯৯ সালে ফ্লাইট ১৯১ শিকাগো থেকে যাত্রা শুরু করার কিছুক্ষনের মধ্যে বিধ্বস্ত হয়। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হল, এরপর যত বিমান এই নামে করা হয়েছিল সবই গন্তব্যে যাওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যায়।
সাত:১৯৪৯ সালে বারমুডা থেকে জ্যামাইকা যাওয়ার পথে ব্রিটিশ সাউথ এয়ারওয়েজ এর “স্টার এরিএল” বিলিন হয়ে যায়। বলা হয় যে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে প্লেনটির এ দশা হয়।
আট:উরুগুয়ের একটি প্লেন খারাপ আবহাওয়ায় পরে আন্দিজ পর্বতে আছড়ে পড়ে। ৪৫ জনের মধ্যে মাত্র ১৬ জন ঘটনাস্থলে বাকিদের মৃতদেহ খেয়ে বেঁচেছিলেন। ১৯৯৩ সালে এই অবিশ্বাস্য ঘটনা নিয়ে একটি মুভিও করা হয়।
নয়:মিশরীয় ফ্লাইট ৯৯০ এর ক্র্যাশ করার ঘটনাটি অনেকটাই কাকতালীয়। পাইলট আর কো-পাইলটের মধ্যে বাক বিতণ্ডায় প্লেনটির এই হাল হয় বলে জানা যায়।
দশ:২০০৯ সালে আটলান্টিক মহাসাগরের উপর হারিয়ে যায় ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭। জানা যায় যে, বরফের খণ্ড বিমানের মুখ বন্ধ করে দেয় আর অটো পাইলট এর সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যার কারনে বিমানটি গতিবিধি হারিয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে ৫০টি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বিমানটির আরও কিছু অংশ পাওয়া যায় যেখান থেকে আরও ১৪৭ টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বাদবাকি ৭৪ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন!
[b]ঢাকা, ১০ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম)//এমএ
[/b]