পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূলপ্রধান মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপির সঙ্গে মিডিয়ার একাংশ হাত মিলিয়ে সারদা কেলেঙ্কারি প্রশ্নে তার ও তার দলের বিরুদ্ধে কুৎসা করছে। তিনি আরো বলেন, সারদার টাকায় তাকে খেতে হয় না। তার দলকেও খেতে হয় না। তার বিরুদ্ধে কুৎসা, অপপ্রচার চলছে। দোষীদের আড়াল করে তাকে গালিগালাজ করা হচ্ছে।
শুক্রবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে এই মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। চ্যানেলের সাক্ষাৎকারটা নেয়া হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয় নবান্নতে। তার এই সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে আজকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়।
আজকাল জানায়, এক প্রশ্নের উত্তরে মমতা বলেন যে ‘আমার ছবি বিক্রি করা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ছবি আমি কাকে বিক্রি করব, তার জবাবদিহি আমি করব না। টাকা রোজগারের জন্য বই লিখি, ছবি আঁকি, কার্ড তৈরি করি- এ সব না করলে সংসার চালাব কী করে? চুরি করব? ছবি বিক্রির টাকা আমার অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি। দলকে এবং জাগো বাংলাকে আমি টাকা দিই।
এদিন সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে মমতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করে বলেন, ‘আচ্ছে দিন, না, এসেছে রোনা দিন?’ ১০০ দিনের মধ্যে ১০০ শতাংশ ব্যর্থ মোদি। অধিকাংশ দিন মোদি দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। সারদা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মমতা।
তিনি বলেন, যাঁরা চিট করেছেন তাঁদের ঠান্ডাঘরে বসিয়ে রেখে আমাদের দোষ দেয়া হচ্ছে। আমাদের নাকি জেলে পুরে দেবে। কত বড় সাহস বিজেপি নেতাদের! নিজেরা জেল খেটে এসে বাংলায় এ ধরনের কথাবার্তা বলছেন। আমাকে যখন গালিগালাজ করেন, তখন আমার কষ্ট হয়। আমি ঘৃণাবোধ করি। আর ভাবি, এদের অপপ্রচারের জবাব মানুষ দেবে। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহর নাম না করে মমতা বলেন, এক গুন্ডা-নেতা বাংলায় এসে আমার সম্পর্কে বলে গেলেন, আমাদের সময় ১৭ লাখ আমানতকারী প্রতারিত হয়েছেন।
মমতা বলেন, ওই নেতা মিথ্যে কথা বলে গেছেন। ১২ লাখ মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ৫ লাখ আমানতকারীর টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। ওই নেতাকে উত্তর দিতে হবে, তা না হলে নাকে খত দিতে হবে। মানুষ তা না হলে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। মমতা বলেন, বাকি প্রতারিতদের টাকা অরুণ জেটলিকে ফেরত দিতে হবে।
পঞ্চায়েত, লোকসভা নির্বাচনের সময় সারদা নিয়ে হইচই করা হয়েছিল। মমতা এদিন অর্পিতা ঘোষ ও অপর্ণা সেন সম্পর্কে বলেন, অর্পিতা তো একজন কর্মী ছিলেন মাত্র। অপর্ণা সেনের অন্যায় কোথায়? তিনি তো একটা ম্যাগাজিনে কাজ করতেন। প্রবাদপ্রতীম তিনি। তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছিলেন। আমন্ত্রণ গ্রহণ করব না? কোনো সাংবাদিক আমার সঙ্গে কথা বলতে এলে তাঁর সঙ্গে কথা বলব না?
কুণাল ঘোষের নাম না নিয়ে মমতা বলেন, অন্যায় করেছেন জেলে গেছেন। এখন বাঁচার জন্য যা খুশি তাই বলছেন৷ প্রমাণ কোথায়? একজন চোরকে ধরা হয়েছে। দিল্লির নাকের ডগায় একটি বড় চিটফান্ড ৪৫ হাজার কোটি টাকা প্রতারণা করেছে। অরুণ জেটলি মহাশয় কী করবেন?
মমতা এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমার টাকার কোনো প্রয়োজন হয় না। লোকসভা থেকে ৫০ হাজার টাকা পেনশন নিতে পারতাম। নিই না। তার কারণ আমার প্রয়োজন হয় না।
মিডিয়ার একাংশকেও এদিন মমতা আক্রমণ করেন। তিনি বলেন সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-র সঙ্গে মিডিয়ার একাংশ হাত মিলিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা করছে। কেন্দ্রে কংগ্রেস এবং বিজেপি ক্ষমতায় ছিল। সেই সময় চিটফান্ডগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন? চ্যানেল তৈরি হওয়ার সময় কেন্দ্রের ক্লিয়ারেন্স লাগে। কেন তারা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছিল? সাংবাদিকদের আমি দোষ দেব না। তাঁরা তো স্রেফ চাকরি করেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে এদিন মমতা বলেন, তৃণমূলের ভাবমূর্তি ক্ষতি করার ক্ষমতা কারো নেই। যদিও মিডিয়ার একাংশ কুৎসা করেই চলেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু মিডিয়া কুৎসা করছে। এরা স্বার্থপর দৈত্য। মাথা সব সময় উঁচু করে চলি। মানুষ ছাড়া আমাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তৃণমূলে ভালর সংখ্যাই বেশি। এক-দুজন খারাপ থাকতেই পারে। তা নিয়ে পুরোটা বিচার করা ঠিক নয়।
বিজেপি-কে আক্রমণ করে মমতা বলেন, ১০০ দিনের মধ্যেই ওরা দেশটাকে বিক্রি করে দিয়েছে। রেল নিয়ে বাংলাকে বঞ্চনা করেছে। হাজার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলার উন্নয়ন হচ্ছে। সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপির হিংসে হচ্ছে। ভারতে একমাত্র স্বচ্ছ দল তৃণমূল। আমরা টাকার কাছে মাথা নত করিনি। এখন বিপদে পড়লে মানুষ ভাবে মমতা আছে। আগে তো আমার মতো কেউ এগিয়ে আসতেন না।
সিন্ডিকেট নিয়ে মমতা বলেন, আমি সিন্ডিকেটের পক্ষে নই। সিপিএমের আমােলে এগুলো হয়েছে। অবক্ষয় দূর করতে সময় লাগবে। কিছু বেকার ছেলে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। সব সিন্ডিকেট, সব প্রমোটার খারাপ নয়। শিক্ষা নিয়ে অহেতুক অপপ্রচার করা হচ্ছে। কোথাও কোনও অন্যায় হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি কামাতে আসিনি।
সাক্ষাৎকারে মমতা বলেন, ২১ হাজার কোটি টাকা দেনা মেটাতে হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে কাজ করছি। বাংলার উন্নয়ন অনেকে দেখতে পাচ্ছেন না। কান, চোখ থাকলে তো দেখতে পাবেন! জঙ্গলমহলে এখন শান্তি। পাহাড়ও শান্ত। মাঝেমধ্যে দিল্লির নেতারা পাহাড়ের নেতাদের দিল্লিতে ডেকে নিয়ে বলছেন, তোমরা গোলমাল করো। যদিও পাহাড়ের মানুষ এখন এ সব চাইছেন না।
মমতা এদিন বলেন, কিছু রাজনৈতিক সঙ্ঘর্ষে কয়েকজন মারা গেছেন। এটা না ঘটলেই ভালো হতো।
রাজ্যের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলার মডেলকে এখন সকলেই অনুসরণ করছে। ১০০ দিনের কাজে আমরা প্রথম। কন্যাশ্রী, যুবশ্রী প্রকল্প চালু হয়ে গেছে। ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান চলছে। মানুষের কোনো অভিযোগ নেই। ইতিমধ্যে জেলায় ৭২টি প্রশাসনিক বৈঠক করেছি।
মমতা বলেন, আমি মনে করি জনগণের সরকার মানুষের কাছে ছুটে যাবে। ভারী শিল্প নেই বলে অপপ্রচার করা হচ্ছে। খড়গপুর ও ডোমজুড়ে বড় শিল্প হচ্ছে। গাজোলডোবা, ঝড়খালিতে বড় প্রকল্প হচ্ছে। হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু হচ্ছে। সারদা থেকে কংগ্রেস, বিজেপি টাকা নিয়েছে। তারাই এখন দালালি করার জন্য রাস্তায় নেমেছে। আমরা এক পয়সা নিইনি। ময়দানের কয়েকটি ক্লাব ও পুজো কমিটিকে টাকা দেয়া হয়েছে। সেখানে আমি কী করব! এটা তো আমার ব্যাপার নয়।
ঢাকা,১৩ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এএইচ





