মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর জাতিগত নিধন অভিযানের বিষয়ে অবশেষে মুখ খুলল জাতিসংঘের শীর্ষ সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদ।
১৫ সদস্যবিশিষ্ট সংস্থাটি সর্বসম্মতিক্রমে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যাতে রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ ও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা মেনে নিতে দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইটকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, চলমান অভিযানকে জঙ্গিবিরোধী আখ্যা দিয়ে মিয়ানমারকে আবারও স্বাগত জানিয়েছে চীন। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফেরার অধিকারসংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় চীন। এশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল নিউজ এশিয়া জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিসর ওই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল।
ব্রিটেন ও অস্থায়ী সদস্য সুইডেনের আহ্বানে বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ১৫ সদস্যের এই পরিষদ মিয়ানমারের রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অতিরিক্ত সহিংসতার খবরে উদ্বেগ জানিয়েছে। এতে রাখাইন রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, স্বাভাবিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং শরণার্থী সমস্যার সমাধান করার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় নিরাপত্তা পরিষদ।
এ ছাড়া সম্প্রতি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনে প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেয়াসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির সমস্যা সমাধানে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিষদের বৈঠকে সদস্য দেশগুলো রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের গুরুত্বের ব্যাপারে একমত হয়। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারকে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রস্তুত রয়েছে বলেও বৈঠকে নিশ্চিত করা হয়।
এর আগে রোহিঙ্গা সংকট নিরাপত্তা পরিষদে বেশ কয়েকবার আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু চীন ও রাশিয়ার ভেটোর কারণে এই সঙ্কটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া দূরে থাক, কোনো বিবৃতিও দিতে পারেনি পরিষদ।
কিন্তু গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা শুরু করেছে তা বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। এ অবস্থায় চীন ও রাশিয়া আগের মতো ভেটো প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারণে মিয়ানমারের গণহত্যার পৃষ্ঠপোষক বিবেচিত হওয়ার আর ঝুঁকি নেয়নি।
নিরাপত্তা পরিষদের বুধবারের বৈঠকের পর জাতিসংঘে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ রাইক্রফট বলেন, গত নয় বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই প্রথম সর্বসম্মতিক্রমে বিবৃতি দিতে সম্মত হল সংস্থাটি।
এই শরণার্থীদের সহায়তা করতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। এ ছাড়া বাংলাদেশকে এই প্রচেষ্টায় সমর্থন করতে জাতিসংঘসহ অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সহযোগিতাকেও স্বাগত জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদে রাখাইনে সব ধরনের উদ্বাস্তুদের কোনো বৈষম্য ছাড়াই মানবিক সহায়তা প্রদানে মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকারের বিষয়টি আলোচিত হয়।
মিয়ানমার সরকারকে অঙ্গীকার পূরণ, রাখাইনে উদ্বাস্তুদের ত্রাণসহায়তা কাজের সুযোগদান, ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে পরিষদ।
গত ২৫ আগস্ট ভোররাতে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশের সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যদের সংঘর্ষ হয়।
এ সংঘর্ষের পর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। ফলে ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গা হত্যা-ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, এ অভিযানকালে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে এবং প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় চার লাখ মানুষ।
বৈঠকের আগে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক পরিস্থিতি বিপর্যয়কর অবস্থায় পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে যখন আমরা মিলিত হয়েছিলাম সেই সময় এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল। এই সংখ্যা এখন তিনগুণ হয়ে প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার হয়েছে।
পাঁচ দেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স। এসব দেশ নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনো প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তকে ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে আটকে দিতে সক্ষম।





