কাশ্মিরের শ্রীনগর এস এম এইচ এস হাসপাতালে কোনও বেড খালি নেই। প্রতিটি ওয়ার্ডে বেডের চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রায় সকলেরই চোখে ছররার ক্ষত। একটি বেডে রয়েছে চার বছরের মোজামিল। সপ্তাহকয়েক আগে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।এক চোখেই দেখতে পায় সে।
বারামুলার কারামতালার বাসিন্দা মনসুর আহমেদ শেখের পুত্র মোজাম্মিল। হাসপাতালে ছেলের পাশ থেকেই ফোনে তিনি বলেন, ‘‘সারাজীবন বোধহয় ওকে এক চোখ দিয়েই দেখতে হবে! কাশ্মীরিদের ভাগ্যটাই এরকম।’’ ভাই মহম্মদ আশরাফকে নিয়ে আপাতত হাসপাতালেই থাকছেন মনসুর।
কী করে এমন হল? মনসুর বলেন, ‘‘আমাদের ওখানে সন্ধ্যার পর এমনিতেই মেয়েরা আর বাচ্চারা বাড়ি থেকে বেরোয় না। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা সকলে বাড়িতেই ছিলাম। বিকেল থেকে গন্ডগোল চলছিল। জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের কয়েকজন হঠাৎ আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। মারধর শুরু করে।’’ বাবা জানালেন, পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তাঁর ছোট্ট ছেলে। সেই সময় সেনার ছোড়া ছররা চোখে লাগে মোজাম্মিলের। হঠাৎ মারধর করল কেন পুলিশ? মনসুরের কথায়, ‘‘এ তো প্রতিদিনের ব্যাপার। কে কাকে কেন মারে, কেউ জানে না।’’
প্রতিবেশীদের সহায়তায় মোজাম্মিলকে প্রথমে বারামুলার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে শ্রীনগরে। মনসুর জানিয়েছেন, যে অ্যাম্বুল্যান্সে মোজাম্মিলকে শ্রীনগরে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেখানেই আরও অন্তত ২০টি শিশু ছিল। ছররা গুলি লেগেছিল তাদের সকলের চোখে।
আশরাফ বলেন, ‘‘শ্রীনগরে নিয়ে আসার পর মোজামিলের অস্ত্রোপচার হয়েছে। তবু ডান চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না ও। মনে হয় সে আর দেখতে পাবে না। তার অর্ধেক জীবনটাই অন্ধ ’’ তিনি জানিয়েছেন, দিল্লি থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেখানে যাওয়ার কথা। তাঁরাই চিকিৎসা করবেন মোজামি এবং বাকি আহতদের।
আশরফের কথায়, ‘‘এখানে বাচ্চাদের দু’টো ওয়ার্ড। প্রত্যেকটাতে ৫০টা করে বেড। কিন্তু ভর্তি রয়েছে অন্তত ১৫০ জন। তাই যাদের বেডে জায়গা হয়নি, তাদের মাটিতেই শোওয়ানো হয়েছে।’’ শিশুদের পরিবারের জন্য হাসপাতালের একটা বড় অংশকে ‘ওয়েটিং রুম’ তৈরি করা হয়েছে। সেখানেই তাঁরা খাচ্ছেন, ঘুমোচ্ছেন।
আশরাফ বলেছেন, ‘‘শ্রীনগরের মানুষ আমাদের খুব সাহায্য করছেন। অনেকে তো এখানকার লোকেদের বাড়িতেও রয়েছেন। হাসপাতালের বাইরে ২০টা কাউন্টার খোলা হয়েছে। সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খাবার পাওয়া যায়। আমরা তো সেখান থেকেই খাবার নিয়ে খাচ্ছি।’’ তিনি জানিয়েছেন, ছররায় আহত শিশুদের চিকিৎসার জন্য যা ওষুধ প্রয়োজন, তা হাসপাতালের তরফেই বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের জন্য টাকা লাগলেও ওষুধ বা চিকিৎসকের ‘ফি’ দিতে হচ্ছে না।
বাবা-কাকা হাসপাতালে থাকলেও মোজাম্মিলের মা বারামুলা থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন। তাঁর হাসপাতালে থাকার উপায় নেই। কারণ, বাড়িতে তাঁর আরও দুই সন্তান রয়েছে। একজনের বয়স আট, আরেকজনের দুই।
জেড





