একদিকে উষ্ণায়নের দাপট থেকে রক্ষা নেই। এর সঙ্গে যোগ হল গত ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্প ও তার ২৭০টি আফটারশক। দুয়ে মিলে নেপাল-হিমালয়ের এভারেস্ট অঞ্চলের হিমবাহ লুপ্ত হওয়ার পথে। পরিস্থিতি এমনই যে, আগামী শতকের গোড়ায় ওখানে হিমবাহের বহর শতকরা ৭০ থেকে ৯০ ভাগ কমে যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা।
ইউরোপীয় ভূ-বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান জিওসায়েন্সেস ইউনিয়ন (ইজিইউ)-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা-রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে এই বিপদের পূর্বাভাস দিয়েছে নেপালের পর্বত-বিজ্ঞান সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)।
তাদের হুঁশিয়ারি: ২৫ এপ্রিলের ৭.৯ রিখটারমাত্রার তীব্র ভূকম্প ও পরবর্তী আফটারশকের ঠেলায় নেপালের পাহাড় জুড়ে ধস নামতে শুরু করেছে। বর্ষায় যা বেড়ে গিয়ে প্রবল বিপদ সৃষ্টি করতে পারে।
সেন্টারের এক প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, ইজিইউ-র সমীক্ষায় এভারেস্ট অঞ্চলে হিমবাহ-সঙ্কটের যে ছবি মিলছে, তা এমনিতেই যথেষ্ট উদ্বেগজনক। তার সঙ্গে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি যুক্ত হলে ওই তল্লাটের ৪০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের হিমবাহের সিংহভাগ দ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার প্রভূত আশঙ্কা।
নেপাল-ফ্রান্স-নেদারল্যান্ডসের ভূ ও জল-বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রয়াসে তৈরি ইজিইউ-র গবেষণাপত্রটি বুধবার প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-পত্রিকা ‘দ্য ক্রায়োস্ফিয়ার’-এ।
প্রধান সমীক্ষক তথা জল-বিজ্ঞানী জোসেফ শিয়া তাতে বলেছেন, 'পরিমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন-সহ বিবিধ গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়তে থাকায় আগামী ক’বছর ধরে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার গতি হবে উর্ধ্বগামী।
নানা প্রাকৃতিক কারণে নেপাল-হিমালয়ের এভারেস্ট অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রাবৃদ্ধির সেই আনুমানিক হার এতটাই বেশি থাকবে যে, ২১০০ সালের মধ্যে ৭০ ভাগ থেকে ৯০ ভাগ হিমবাহ গলে যেতে পারে।'
অর্থাৎ, তামাম বিশ্ব-পরিবেশের নিরিখেই মারাত্মক অশনি সঙ্কেত। আইসিআইএমওডি-র সঙ্গে যুক্ত জল-বিজ্ঞানীদের দাবি: মেরু অঞ্চলকে বাদ দিলে হিমালয়ের এই
অংশটাতেই সর্বাধিক এলাকা জুড়ে হিমবাহ তৈরি হয়েছে। তা গলে গেলে গোটা অঞ্চলের ভৌগোলিক চরিত্র যেমন বদলে যাবে, তেমন এখানে উৎপন্ন নদীগুলোর গতিপথও পাল্টে যাবে। ভেঙে-চুরে খানখান হয়ে যাবে নদী-পাহাড়ের বিপুল বাস্তুতন্ত্র। নেপাল হিমালয়ে কৃষি ও জলবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগের ছায়া ঘনিয়েছে।
নেপালের দুধকোশী অববাহিকায় ক্যাম্প করে হিমবাহের বিপদ যাচাই করার পরে সমীক্ষকেরা জানাচ্ছেন, এভারেস্ট অঞ্চলে হিমবাহ গলে গেলে সর্বাধিক প্রভাব পড়বে কোশী নদীতে। একটা সময়ে তার জল নেমে যাবে তলানিতে। নদীটির উপরে যাঁরা নিভর্রশীল, তাঁদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হবে।
বস্তুত আইসিআইএমওডি বলছে, ভূমিকম্পের জেরে যে ভাবে ধস নেমেছে, পাহাড়ে চিড় ধরেছে, তাতে ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে কোশীর উৎসস্থলে। কোথাও নতুন নতুন প্রাকৃতিক জলাধারগজিয়ে উঠেছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে কৃত্রিম জলাধারের অস্তিত্ব বিপন্ন। এক গবেষকের কথায়, ‘‘বর্ষায় কোশী কী চেহারা নেবে, বলা মুশকিল। হড়পা বানে পাহাড়ি জনপদ ভেসে যেতে পারে। আবার সাংঘাতিক বন্যায় সমতল বিধ্বস্ত হতে পারে।’’
কিন্তু আগামী শতকের মধ্যে বিপুল হিমবাহ বিলুপ্তির পূর্বাভাস মিলল কী ভাবে?
সমীক্ষার দাবি: স্থানীয় আবহাওয়া দফতরে গত ৫০ বছরের তাপমাত্রার যে পরিসংখ্যান, তার সাহায্যে হিমবাহ গলনের রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তাপমাত্রা কত বাড়লে হিমবাহ কতটা গলে যায়, তৈরি হয়েছে তার আনুপাতিক হিসেব।
অঙ্ক কষে বার করা হয়েছে, আগামী ক’বছরে তাপমাত্রা কী হারে বাড়বে। ‘‘নেপাল-হিমালয়ে দিনের পর দিন পড়ে থেকে আমরা সমীক্ষা চালিয়েছি। তার পরে জার্নালে প্রকাশ করেছি আশঙ্কার কথা।’’— মন্তব্য এক সমীক্ষকের। তাঁদের পর্যবেক্ষণ: নেপাল সংলগ্ন হিমালয়ে জানুয়ারিতেও যথেষ্ট বরফ জমছে না। অন্য দিকে জুলাই-অগস্টে বরফ হুড়মুড়িয়ে গলে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে হিমালয়ে হিমবাহের আয়তন দিন দিন কমছে। আইসিআইএমওডি’র আশঙ্কা, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও ধসের জেরে এই ধ্বংস-প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
এআর





