শূন্য রেল লাইনের উপর দিয়ে ক্যামেরার গতি ক্রমে বাড়ছে। সেই সঙ্গে চড়ছে ‘দোহাই আলি’-র সঙ্গত! গতি বেড়ে ক্যামেরা ক্রমশ আছড়ে পড়ল কাঠের গুঁড়ির উপর। সীমান্তে আটকে গেল রেললাইন। পর্দা জুড়ে অন্ধকার। ও-পারে বাংলাদেশ (তখনও পূর্ব পাকিস্তান)! ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমলগান্ধার’ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্য।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর হঠাৎই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে রেল যোগাযোগ। সেই রেলপথগুলিতে আগাছা জন্মেছে দশকের পর দশক, চাকা গড়ায়নি।
দীর্ঘ দিন পর সীমান্তের কাঠের গুঁড়িতে আটকে যাওয়া সেই সব শূন্য লাইনগুলিতে রেল চলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায় মোদি সরকার।
রেল লাইনগুলো হল, খুলনা-যশোর-বেনাপোল-কলকাতা রুটে দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করা। এছাড়া, আসামের করিমগঞ্জ জেলার মহিশাসন স্টেশন থেকে বাংলাদেশ হয়ে কলকাতা পর্যন্ত একটি পরিত্যক্ত রেললাইন এখনও রয়েছে।এই রেললাইন চালু হলে দক্ষিণ আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ উন্নত হবে।
এদিকে, স্বাধীনতার আগে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার-শিলিগুড়ি থেকে বর্তমান বাংলাদেশের নীলফামারি, ইশ্বরদি হয়ে কলকাতা পর্যন্ত একটি জনপ্রিয় রেল যোগাযোগ ছিল। সেটিকেও আবার চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি আগরতলা থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার রেল যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনা হবে আসন্ন শীর্ষ বৈঠকে। ভারতীয় বিনিয়োগে এই রেললাইন পাতার কাজ শুরু হয়েও বন্ধ হয়ে রয়েছে জমি অধিগ্রহণের সমস্যায়। সেটিকে দ্রুত শেষ করার কথা থাকছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতিতে।
সূত্রে জানা যায়, এ জন্য মোদী-হাসিনা বৈঠকের পর খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক নয়াদিল্লি সফরে যাবেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের বক্তব্য, এ ব্যাপারে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ আর্থিক কমিশনের একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। দু’দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে রেল যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়েও সবিস্তার আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া, মোদীর আসন্ন ঢাকা সফরে শুধু সমঝোতাপত্র সই করাই নয়, হাতে কলমে দ্রুত কীভাবে কাজ শুরু করা যায় সে ব্যাপারে রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন মোদী।
১৯৬৫ সালে রেল যোগাযোগ বন্ধের পর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর আবার বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে আসলে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করেছিলেন।
আগামী ৬ তারিখ ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও থাকার কথা রয়েছে। দু’দেশের মধ্যে পুরনো রেল যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে মমতাও সমান আগ্রহী। তার নির্দেশে তৃণমূলের তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুকুল রায় এ বিষয়ে সক্রিয় হয়েছিলেন।
মোদীর আসন্ন ঢাকা সফরের মূলমন্ত্র— দু’দেশের মধ্যে সব ধরনের যোগাযোগ বাড়ানো। পুরনো রেল লাইনগুলিকে চালু করার বিষয়টি এতদিন ঢিমে-তালে চলার পর এবার এই প্রচেষ্টায় গতি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, আরও একটি নতুন রেল যোগাযোগ তৈরি করার সম্ভাবনা নিয়ে গত মার্চ মাসে একদফা বৈঠক হয়ে গিয়েছে দু’দেশের মধ্যে। প্রস্তাবিত কলকতা-খুলনা সরাসরি রেল যোগাযোগের বিষয়ে এখনও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ছাড়পত্র দেয়নি। মোদীর সফরে এ ব্যাপারেও অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। (সূত্র: আনন্দ বাজার)
ইআর





