মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের নারকীয় তাণ্ডবের নতুন তথ্য পাওয়া গেছে স্যাটেলাইটে প্রাপ্ত তথ্য থেকে। ওই প্রদেশের অন্তত ১০টি অঞ্চলে সেনাবাহিনী অভিযানের নামে মুসলিম বসতিতে ব্যাপক জ্বালাও পোড়াও চালিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch -HRW)” এর কর্মীদের অভিযোগ নিরস্ত্র রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশুদের ওপর মিয়ানমার সেনারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও আগুন হামলা চালিয়েছে।

এদিকে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই অঞ্চলে গত শুক্রবার পুলিশ ফাঁড়িতে সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (Arakan Rohingya Salvation Army -ARSA)) হামলা চালানোর পর এ পর্যন্ত ১০০ জন হতাহত হয়েছে।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের’ সাথে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ চলাকালে রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়।

অপরদিকে, সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, সেনাসদস্যরা তাদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে, মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারছে, নির্বিচারে গুলি করছে এবং গণহত্যা চালাচ্ছে।

এমনকি ছোট বাচ্চারাও মিয়ানমার সেনাদের তাণ্ডব থেকে রেহাই পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রোহিঙ্গা মুসলিমদের। এ অভিযোগের ব্যাপারে অবশ্য মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্রের কোন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও রাখাইন অঞ্চলে বিদেশেী গণমাধ্যম, মানবাধিকার কর্মী, সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান কিংবা কোন পর্যবেক্ষক পর্যন্ত প্রবেশ করতে দিচ্ছে না শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুকির সরকার।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার (২৯ আগস্ট ২০১৭) দেয়া এক বিবৃতিতে রাখাইন অঞ্চলে জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা তদন্তে ও সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক সংস্থাকে ওই অঞ্চল পরিদর্শদের আহবান জানানো হয়।

স্যাটেলাইট তথ্যের বরাত দিয়ে এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরো দাবি করা হয়, মিয়ানমার সেনারা প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।

বিগত ২০১৬ সালের অক্টোবরে রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের ওপর চালানো নারকীয় অভিযানের চেয়েও এই তাণ্ডব ভয়াবহ বলেও দাবি করা হয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষে থেকে। সেই অভিযানের সময় উগ্রবাদী বৌদ্ধ ও সেনারা প্রায় দেড় হাজার বাড়িঘর ধ্বংস করেছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর ফিল রোবার্টসন (Phil Robertson) বলেন, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া এই নতুন তথ্য জাতিসংঘ ও অপরাপর দাতাদের উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেবে। তারা বার্মিজ সরকারকে রাখাইন প্রদেশে চলমান ধ্বংসযজ্ঞ অচিরেই বন্ধ করারও আহবান জানাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রোবার্টসন।

এদিকে, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেজ (Antonio Guterres) এর মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক (Stephane Dujarric) বলেন, সাধারণ নাগরিকদের ওপর চালানো এমন হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মহাসচিব অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

দুজারিক সহিংসতার কবলে পড়া সাধারণ নাগরিকদের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। মিয়ানমার সেনা ও বৌদ্ধদের তাণ্ডব থেকে পালিয়ে আসা বেশ কিছু নারী ও শিশুদের প্রতি বাংলাদেশ সরকারকে সদয় হওয়ার আহবান জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র আরো বলেন, এদের মধ্যে অনেক আহত নারী ও শিশুও রয়েছে।

এদিকে, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী তথাকথিত শান্তির দূত অং সান সুকি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাপারে তার ন্যাক্কারজনক পক্ষপাতমূলক আচরণের জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হচ্ছেন।

উল্লেখ্য, গত তিনদিনে রাখাইন অঞ্চল থেকে অন্তত ৩০০০ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশ সীমান্তে পালিয়ে এসেছে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু এবং অনেকেই গুলিবিদ্ধ। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবি তাদেরকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। অনেককেই জোর করে ফেরত পাঠাচ্ছে।

তবে, টেকনাফ ও উখিয়াসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই গোপণে অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাহায্য করছেন। বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

(সূত্র: আলজাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা)