গঙ্গার বুকে নৌকা বেয়ে প্রায় চারশো কিলোমিটার অতিক্রম করে সোমবার কলকাতায় পৌঁছেছেন পশ্চিমবঙ্গের বারো জন যুবক। এদের কারও একটা হাত বা পা নেই। কেউ মূক-বধির। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে সাঁতারুও এদের কয়েকজন। তবুও অনেকের কাছেই কানা-খোঁড়া শুনতে হয়।
অন্যান্য স্বাভাবিক মানুষেরই মতো বা কোনও ক্ষেত্রে আরও বেশী কিছু করতে পারেন প্রতিবন্ধকতা নিয়েও, সেটা দেখিয়ে দিতেই এই অভিযানে নেমেছিলেন সবাই।
'বিয়ন্ড বিলিফ' নামের এই অভিযানে চারটি দেশী নৌকা বেয়ে পাঁচ দিনে এই পথ পেরোলেন তিনজন মূক ও বধির আর বাকিদের কারও একটা হাত নেই, কারও বা একটা পা।
ভোলানাথ দলুইয়ের একটা পা নেই।
"আমার যখন বছর তিনেক বয়স, একলা রাস্তায় বেরিয়ে গিয়েছিলাম। পিছন থেকে একটা ট্রাক ধাক্কা মারে। পড়ে গিয়েছিলাম আর পায়ের ওপর দিয়ে ট্রাকটা চলে গিয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে – একটা পা বাদ দিতে হয় সেদিনই," বলছিলেন মি. দলুই। আরেক অভিযাত্রী জয়দেব মণ্ডলের একটা হাত আগুনে ঝলসে গিয়েছিল তাঁর যখন তিন মাস বয়স।
এইসব প্রতিবন্ধকতা নিয়েই গঙ্গায় নৌকা বওয়ার মতো কঠিন শারীরিক পরিশ্রম করলেন পাঁচ দিন ধরেই। "আমরাও যে কিছু করতে পারি, সেটাই দেখিয়ে দিতে চাই। যাতে মানুষ আমাদের চিনতে পারে, ল্যাংড়া – খোঁড়া না বলে।"
আরেক অভিযাত্রী প্রিয়ব্রত সাধুর বাঁ পা পোলিওতে নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলছিলেন, "এর আগেও পাহাড়ে- জঙ্গলে অভিযানে গেছি আমরা। তারও আগে অনেকগুলো জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় নেমেছি। তিনটে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগ পেয়েছিলাম – টাকার অভাবে যেতে পারি নি। সরকার তো কোনও সাহায্য করে নি।" মায়ের সামান্য অবসর-ভাতাতেই সংসার চলে প্রিয়ব্রত সাধুর।
এদের সবাইকেই চালাতে হয় এক অসম যুদ্ধ – লোকে হেয় করে 'কানা-খোঁড়া' বলে, আর অন্যদিকে সরকারী সাহায্যের আবেদন করলেও কেউ দেখে না।
ভোলানাথ দলুইয়ের কথায়, "আমরাও যে কিছু করতে পারি, সেটাই দেখিয়ে দিতে চাই। যাতে মানুষ আমাদের চিনতে পারে, ল্যাংড়া – খোঁড়া না বলে।" শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও নৌকা চালানোটা রপ্ত করতে হয়েছে এদের।
মূল প্রশিক্ষক প্রদীপ্ত ঘোষাল বলছিলেন কীভাবে সেই প্রতিবন্ধকতা কাটাতে হয়েছে।
"এদের যেহেতু একটা অঙ্গ নেই, তাই ভারসাম্য রাখাটা খুব দরকার। সেটাই ধরে ধরে শেখাতে হয়। তবে ভারসাম্য বজায় রেখে কীভাবে নৌকা বাইতে হবে, সেই কাজটা ওদের নিজেদেরই করতে হয়। আমরা শুধু সাহায্য করি, দেখিয়ে দিই।"
বিয়ন্ড বিলিফ অভিযানটি যে সংগঠন পরিচালনা করছে, সেই সুকৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান অভিজিৎ দাশগুপ্ত বলছিলেন, "বিবিসি-তে একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ নামে। কয়েকজন ব্রিটিশ প্রতিবন্ধী নিকারাগুয়ার জঙ্গলে অভিযান চালিয়েছিলেন। আমার মনে হয়েছিল ওঁরা যদি পারেন, আমরা কেন পারব না। সেই শুরু।"
সুকৃতি ফাউন্ডেশন চাইছে, তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষদের অনেকেই, যারা এই প্রতিবন্ধীদের নিচু চোখে দেখেন, তাঁদের কাছে এই বার্তাটা দেওয়া – প্রতিবন্ধীরা এমন কিছু করে দেখাবে, যেটা অন্যরা করতে সাহস পাবে না।
একদিকে যেমন তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষদের সচেতন করে তোলা, তেমনই সরকারি বা বেসরকারি চাকরীও যদি যোগাড় করে দেওয়া যায় এঁদের, সেই চেষ্টাও চালাচ্ছে বিয়ন্ড বিলিফ অভিযান। সূত্র: বিবিসি
আন্তর্জাতিক
চারশো কিলোমিটার নৌকা বাইলেন একদল প্রতিবন্ধী
গঙ্গার বুকে নৌকা বেয়ে প্রায় চারশো কিলোমিটার অতিক্রম করে সোমবার কলকাতায় পৌঁছেছেন পশ্চিমবঙ্গের বারো জন যুবক। এদের কারও একটা হাত বা পা নেই। কেউ মূক-বধির। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে সাঁতারুও এদের কয়েকজন। তবুও অনেকের কাছেই কানা-খোঁড়া শুনতে হয়।





