নরেন্দ্র মোদির ক্যারেশমেটিক নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে ২০১৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি এ যাবৎকালের সবচেয়ে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাহুল গান্ধীর সেই অভিব্যক্তি তার যে ইমেজ তুলে ধরে তাতে তাকে দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজবংশ তথা রাজপরিবারের উদাসীন উত্তরসূরী বলেই প্রতীয়মান হয়েছিল।
মে মাসের সেই নির্বাচনে রাহুলের মা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে নরেন্দ্র মোদির কাছে পরাজয় স্বীকার করেন। নিন্দুকদের কাছে এটা নিশ্চিত হয়ে গেল যে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো লক্ষী ছেলেটি ছাড়া তিনি কখনো অন্য কিছু হবেন না। ভারতের মতো এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি সামলানোর চেয়ে তিনি বরং এবার মধুর ছুটি উপভোগ করবেন।
কিন্তু পরিস্থিতি আসলে কোনোভাবেই আর সেই রকম নেই। নির্বাচনে পরাজয়ের দুই বছর পর বর্তমানে দলে রাহুল গান্ধীর সরব উপস্থিতি আর মুচকি হাসি বেশ অর্থবোধক। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সোনিয়া গান্ধীর ছেলে ও আরেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাতিছেলে হিসেবে ৪৫ বছর বয়সী রাহুল গান্ধীর কাছে ভারতীয়দের সব সময় প্রত্যাশা ছিল যে, তিনিই শেষ পর্যন্ত দেশের নেতৃত্বে আসবেন। নির্বাচনে পার্টির ধস সেক্ষেত্রে তাকে অনেকটা স্বাধীনতা দিয়েছে বলে মনে হয়।
কেননা চলতি বছরের মার্চ মাসে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ঐ পরাজয়কে আমি আশীর্বাদ বলেই মনে করি। এটা প্রচুর অপ্রয়োজনীয় চিন্তা-ভাবনা আমার মাথা থেকে পরিস্কার করতে সাহায্য করেছে।
বস্তুত নরেন্দ্র মোদির জন্য একটা বড় ধরণের হুমকি হিসেবেই আবির্ভূত হচ্ছেন রাহুল গান্ধী। ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে তিনি এক বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ হয়েই দেখা দেবেন।
জনপ্রিয়তা জরিপের ভিত্তিতে আরেকবার জয়ী হওয়ার মতো যথেষ্ট জনপ্রিয়তা এখনো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রয়েছে। তবে ভারতের ১৩০ কোটি জনগণ যাদের বেশিরভাগই এখনো দিনে তিন ডলারের কম আয় করেন তাদের ভোটের হিসেব-নিকেশ ওলট-পালট করে দেওয়ার বেশ নজির রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও রাহুল গান্ধীকে ভাসমান বলে মনে হয়েছিল। ২০১৫ সালের প্রথম দিকে তিনি দুই মাসের ছুটিতে গিয়েছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হলো, কোথায় গেলেন রাহুল গান্ধী? তবে যেখানেই যান, তিনি নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছেন।
এসেই তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মোদিকে এলিট শ্রেণীর ঘুটি হিসেবে উপস্থাপন করে প্রচারণা শুরু করেছেন- যিনি গ্রামের কৃষকদের কোনো তোয়াক্কা করেন না। নতুন এই কৌশলে ভালই কাজে দিয়েছে। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণের আইন সহজ করতে মোদি এক প্রস্তবনা হাজির করলেন। এদিকে তার ক্ষমতাশীন দল বিজেপি ভারতে তৃতীয় বৃহত্তম জনঅধ্যুষিত রাজ্য বিহারের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে।
রাহুল গান্ধী সেই থেকে মোদির বিরুদ্ধে একে একে আক্রমণ করে যাচ্ছেন। বিশাল জনতার উপস্থিতি নিয়ে মুম্বাই থেকে আসাম, আসাম থেকে দিল্লি মোদি বিরোধী সভা-সমাবেশ করছেন। নতুন নতুন কৌশল বের করতে মোদির মতো শীর্ষ রাজনৈতিক কৌশলীও তিনি ভাড়া করেছেন।
২০১৯ সালে বিজয় এখনো বহুদূরে। তবে পিউ রিসার্চের এক গবেষণায় দেখা যায় রাহুল গান্ধীর জনপ্রিয়তা ৫০ ভাগ থেকে বেড়ে ৬২ ভাগে উন্নীত হয়েছে। তবে মোদির জনপ্রিয়তা থেকে তিনি এখনো ২৫ পয়েন্ট পিছিয়ে।
কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র সহযোগী মিলান বৈষ্ণব বলেন, ‘রাজনীতিক হিসেবে রাহুল নিশ্চিতভাবেই বিবর্তিত হয়েছেন। যে কেউই তার হাবভাব, কথাবার্তা ও উপস্থিতি দেখেই এটা বুঝতে পারবে। বছর কয়েক আগেও তিনি দৃশ্যত জাতীয় সংকটের সময়ও অনুপস্থিতই ছিলেন। এখন বিষয়টা আর সেরকম নেই।’
এমআর





