পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কোলকাতার লেকটাউনের একটি আবাসিক এলাকায় শাসনের নামে সাড়ে তিন বছরের শিশুকে লাথি, ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মেরেছেন এক গৃহ শিক্ষিকা। সিসিটিভি ফুটেজে এই বর্বরোচিত ঘটনা দেখে হতবাক হয়ে গেছে শিশুটির পরিবার।
বুধবার পূজা সিং নামে ওই গৃহ শিক্ষিকার বিরুদ্ধে লেকটাউন থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন শিশুটির বাবা সঞ্জয় আগরওয়াল। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই গৃহ শিক্ষিকা বাগুইআটির বিদ্যাসাগর পল্লিতে বাড়ির যে ঠিকানা জানিয়েছিলেন, তা ভুয়া। তবে, পূজার স্বামী চাঁদনি চকের একটি দোকানে কাজ করে বলে জানা গেছে। বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের এডিসি (সল্টলেক) দেবাশিস ধর বলেন, “অভিযুক্তের খোঁজে সম্ভাব্য সব জায়গায় তল্লাশি শুরু হয়েছে।”
সাড়ে তিন বছরের বাচ্চাটি মৌলালির সেন্ট জেম্স স্কুলে নার্সারির ছাত্র। গত ১৫ জুলাই তার জন্য পূজাকে গৃহশিক্ষিকা হিসেবে রাখা হয়েছিল।
শিশুটির মা শালিনী অগ্রবাল জানান, মঙ্গলবার পড়াতে এসে পূজা তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। তার দাবি ছিল, মা ঘরে থাকলে ছেলে ঠিকমতো পড়াশোনা করবে না। শালিনী বেরিয়ে যেতেই দরজাএভতর থেকে বন্ধ করে দেয় পূজা।
শালিনী পরে সাংবাদিকদের বলেন, “কিছুক্ষণ পর থেকেই ছেলের কান্নার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। কেন কাঁদছে জিজ্ঞাসা করলে পূজা ভেতর থেকে বলছিল, ‘আপনি বাজারে চলে যাচ্ছেন ভেবে ও কাঁদছে। কিন্তু অনেক ক্ষণ ধরে কান্না শুনে সন্দেহ হয়।”
অগ্রবাল পরিবারের প্রতিটি ঘরেই নিরাপত্তার কারণে সিসিটিভি লাগানো রয়েছে। সন্দেহের বশেই ড্রয়িং রুমের কম্পিউটার খুলে সিসিটিভি’র ফুটেজ দেখতে বসেন শালিনীদেবী। তখনই দেখতে পান তার ছেলেকে কী নিষ্ঠুরভাবে মারধর করছে পূজা।
এ দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত মা দরজায় ধাক্কা মারতে শুরু করেন। কিন্তু দরজা খুলতে চায়নি পূজা। বেশ কিছু ক্ষণ পরে দরজা খোলে সে। শালিনীদেবী বলেন, “ঘরে ঢুকে দেখি বিছানার উপর ছেলেটা পড়ে আছে। পূজাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন ওকে মেরেছে? ও বলে, ‘না মারিনি, এমনি অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”
শালিনীদেবীর অভিযোগ, তিনি যখন ছেলেকে বিছানা থেকে তুলতে যান, তখনই সুযোগ বুঝে চম্পট দেয় পূজা।
ঘটনার সময় শালিনীর স্বামী সঞ্জয় অগ্রবাল বাড়িতে ছিলেন না। তিনি তখন ব্যবসার কাজে রাশিয়া যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে ৪টার দিকে তড়িঘড়ি বাড়ি চলে আসেন সঞ্জয়বাবু। তিনি বলেন, “এসে দেখি ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পিঠে, মুখে, গায়ে আঘাতের দাগ।” তাঁর অভিযোগ, ৫টার দিকে পূজার স্বামী রোহিত সিংহ এসে হুমকি দেয়, ঘটনাটা যেন পুলিশ কিংবা অন্য কাউকে জানানো না-হয়।
সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ায় ছোট্ট ছেলেটিকে মাটিতে আচড়ে ফেলছেন গৃহশিক্ষিকা। তারপর নির্মম পিটুনি। কেঁদে কঁকিয়ে উঠলেও, রাগ কমছে না শিক্ষিকার। প্রবল আক্রোশ শিশুটির মুখে ও মাথায় এলোপাথারি ঘুষি চালাচ্ছেন তিনি।
ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার পর বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি বলেন, “এটি বর্বরোচিত ঘটনা। নিন্দার ভাষা নেই।” শিশুকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা জানান, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঘটনাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁকে মৌখিকভাবে সব জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার লিখিত রিপোর্ট দেয়া হবে। এ দিন রাজ্যের শিশুকল্যাণ কমিটি এবং শিশু সুরক্ষা কমিটির প্রতিনিধিরা দক্ষিণদাঁড়িতে যান।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন সমাজবিদ, মনোবিদ ও শিক্ষাবিদরাও। মনোবিদ জয়রঞ্জন রাম বলেন, “ছবি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওই মহিলার মানসিক বিকৃতি রয়েছে। স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে ও ভাবে এক শিশুকে লাথি মারা অসম্ভব। সূত্র: আইআরআইবি।
ঢাকা, ২৪ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, টিআই





