ভারতের কর্নাটক রাজ্যে গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে কট্টরপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী বজরং দলের সদস্যরা কয়েকজন দলিতের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই আক্রমণের ঘটনায় দলিত পরিবারের তিনজন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজন পঙ্গু ব্যক্তিও আছেন। ঘটনাটি প্রায় দুসপ্তাহের পুরনো হলেও পুলিশ-প্রশাসন এখনও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রায় কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি, তারা সবাই জামিন পেয়ে আত্মগোপন করেছেন।
গত বছর উত্তরপ্রদেশে বিফ খাওয়ার গুজব ছড়িয়ে মহম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারার পর থেকেই ভারতে এই ধরনের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। দিল্লি থেকে আরও জানাচ্ছেন শুভজ্যোতি ঘোষ :
বিফ খাওয়ার অভিযোগে হামলা চালানোর এই সবশেষ ঘটনাটি ঘটেছে কর্নাটকের চিকমাগালুর জেলায় শান্তিপুর নামে একটি গ্রামে। তবে এখানে আক্রান্তরা মুসলিম নন, তারা ছিলেন দলিত সমাজভুক্ত। প্রায় দুসপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি হয়তো প্রকাশ্যেই আসত না, যদি না কর্নাটক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফোরাম নামে একটি সংগঠন এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করত।
ওই ফোরামের সম্পাদক কে এল অশোক বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ১০ জুলাই রাত সাড়ে দশটা নাগাদ বজরং দলের ৪০-৫০জন গুন্ডা মিলে পালরাজ নামে এক দলিতের বাড়িতে হামলা চালায়। পালরাজ একজন ৫৬ বছর বয়সী দলিত মজুর, সে তখন তার দুই ছেলে ধনুষ ও মুত্থাপ্পার সঙ্গে বসে রাতের খাওয়া খাচ্ছিল।
হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিল সম্পত নামে এক ব্যক্তি – যে এলাকায় কুখ্যাত সমাজবিরোধী নামে পরিচিত, তার নামে একাধিক মামলা ঝুলছে। এরা এসে লোহার রড ও তরোয়াল নিয়ে সোজা এই ব্যক্তিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আহত এই ব্যক্তিদের পরদিন হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও পুলিশ কিন্তু সবার আগে এই দলিতদের বিরুদ্ধেই গোহত্যা নিবারণ আইনে মামলা রুজু করে। অন্যদিকে ঘটনার প্রায় কুড়ি ঘন্টা পরে এফআইআর করা হয় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে, যারা জামিন পেয়ে এর মধ্যে গা-ঢাকাও দিয়েছে।
কর্নাটক রাজ্যে গোহত্যা বা কাউ স্লটার নিষিদ্ধ হলেও বিফ বা গোমাংস খাওয়াতে কোনও বাধা নেই– এমন কী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিএম সিদ্ধারামাইয়া পর্যন্ত কয়েক মাস আগেই ঘোষণা করেছিলেন ইচ্ছে হলেই তিনি বিফ খাবেন, কে তাকে ঠেকাবে?
দলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে সমর্থকদের প্রবল হাততালির মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি আগে কখনও বিফ খাননি ঠিকই– কিন্তু তার খাওয়ার ইচ্ছে হতেই পারে, এবং কেউ তাকে তা থেকে আটকাতে পারবে না। তবে সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী যা-ই বলুন রাজ্যে বিফের বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ আলাদা তা চিকমাগালুরের এই ঘটনাই বলে দিচ্ছে।
কে এল অশোক বলছিলেন– বিফ খাওয়ার নামে হামলা ক্রমশই বাড়ছে, যদিও বিফ রাজ্যের একটা বড় জনসংখ্যার খাদ্যাভ্যাসের অংশ।
কর্নাটকে দলিত সমাজের ৯৯ শতাংশই বিফ খান। পাশাপাশি মুসলিম, খ্রীষ্টান ও আদিবাসী কিংবা উপজাতি সমাজেও গরুর মাংস ভীষণ জনপ্রিয়। তারা এটাকে স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস বলে মনে করেন, বিফে ফ্যাটের পরিমাণও কম। তবে বিফ গরিব মানুষের মধ্যে এত যে জনপ্রিয় – তার প্রধান কারণ হল এটা সবচেয়ে শস্তা মাংস।
পালরাজ বা ভারতে তার মতো কোটি কোটি দলিত পরিবার একমাত্র যে মাংসটা বাজার থেকে কিনে খেতে পারেন, তা হল বিফ বা গরুর মাংস। কিন্তু দেশের নানা প্রান্তে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা গোরক্ষক বাহিনী বা ভিজিলান্টেদের দাপটে তাদের বিফ খাওয়ার পাট উঠতে বসেছে – কিংবা বিফ খাওয়ার অপরাধে বেধড়ক মার খেয়ে ভর্তি হতে হচ্ছে হাসপাতালে!
সূত্র: বিবিসি





