অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ৭২ ঘণ্টা বা তিনদিনের যুদ্ধ-বিরতির দ্বিতীয় দিনও প্রায় শেষ হতে চলছে। প্রায় মাসব্যাপী ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া গাজার বাসিন্দারা এবার স্বচক্ষে ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করার কিছুটা সুযোগ পেলেন।
এদিকে, শেষ যুদ্ধ-বিরতি নিয়ে আলোচনায় বসতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দল এবং মধ্যস্থতাকারীরা মিশরের রাজধানী কায়রোতে জড়ো হয়েছেন, খবর আলজাজিরা।
গত মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়া তিনদিনের যুদ্ধ-বিরতির সময়সীমা বুধবার গভীর রাতে শেষ হবে। দুই পক্ষের লাখ লাখ মানুষকে সাময়িক মুক্তিদানকারী এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগেই মরণঘাতি যুদ্ধ কেড়ে নিল ১৮৭৫ ফিলিস্তিনির জীবন, ৪ শতাধিক শিশুসহ যাদের বেশিরভাগই নারী ও বৃদ্ধ। এছাড়া আহত হয়েছে আরও ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাসিন্দা। অপরদিকে, ৩ বেসামরিক নাগরিকসহ ৬৭ মতান্তরে ১৫০ ইহুদীবাদী সেনা নিহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালকি বলেছেন, তিনি আশা করছেন এই যুদ্ধ-বিরতি আরও ৭২ ঘণ্টা বাড়ানো হতে পারে।
এদেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ধারনা করা হচ্ছে যে, কায়রোতে উপস্থিত হওয়া ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দল একটি স্থায়ী যুদ্ধ-বিরতিতে যেতে অত্যন্ত দরকষাকষিপূর্ণ এক আলোচনায় বসতে যাচ্ছে।
মিশরের রাজধানী কায়রোতে উভয় দেশ তাদের প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়ে নিশ্চিত করলেও দুই দলই সংঘাতমূলক দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে এবং আলোচনায় বসার আগেই কুটনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।
একদিকে, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা গত আট বছর ধরে গাজা উপত্যকায় আরোপিত দখলদার ইসরাইলের অবরোধ পুরোপুরি তুলে নিয়ে সীমান্ত খুলে দেয়ার দাবিতে অনঢ়, অন্যদিকে ইসরাইলের দাবি গাজাকে পুরোপুরি অস্ত্রমুক্ত করা।
এদিকে, ইসরাইলের প্রতি বরাবরই পক্ষপাতিত্ব করে বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রায় শুন্যের কোঠায় নিয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও কায়রোতে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় যোগ দেয়ার কথা রয়েছে।
ওয়াশিংটনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জেন পেসকি বলেছেন, তারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, পরিস্থিতির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে তার দেশ নিজেদের সময়, সামর্থ্য ও অবস্থানকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।
ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম এএফপির খবরে বলা হয়, ২৮ দিন পরে মঙ্গলবার গাজায় কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ ফিরে আসে। এদিন দুপুরের পরে রাস্তায় অনেক লোক বেরিয়ে আসেন, কিছু দোকানপাটও খুলতে দেখা যায়। রাস্তায় কোমলমতি শিশুদের কোলাহল দেখা যায় এবং সমুদ্রপাড়েও মানুষকে বেড়াতে দেখা যায় বলেও এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে, বেশিরভাগ মানুষই বেরিয়ে এসে নিজেদের ও আত্মীয়স্বজনের বাড়ি-ঘর দেখতে থাকেন, যেগুলোর প্রায় সবই মাটির সাথে মিশে গেছে ইসরাইলি নারকীয় হামলায়।
সর্বত্রই যুদ্ধাপরাধের আলামত
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালকি বলেছেন, ৭২ ঘণ্টার মানবিক যুদ্ধবিরতির পর তিনি বিভিন্ন বিধ্বস্ত স্থান পরিদর্শন করেছেন। ইসরাইল তাদের আগ্রাসনের সময় যে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধমূলক নারকীয় কর্মকান্ড করেছে তার প্রমান খুবই পরিস্কার।
মালকি মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (International Criminal Court) প্রসিকিউটরদের সাথে সাক্ষাত করেছেন এবং গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের একটি সুষ্ঠ তদন্ত দাবি করেছেন।
এদিকে, গত সপ্তাহে জাতিসংঘ পরিচালিত এক তদন্তে দেখা গেছে, গাজায় ইসরাইল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করেছে এবং অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপক প্রাণহানী হয়েছে এবং তাদের ধন-সম্পদের বিপুল ক্ষতিসাধিত হয়েছে বলেও জাতিসংঘ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মালকি আরও বলেন, গত ২৮ দিনে ইসরাইলের পক্ষ থেকে সংগঠিত প্রায় প্রতিটি কর্মকান্ডের মধ্যে যুদ্ধপরাধের পরিস্কার আলামত দেখা গেছে এবং তারা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘক করেছে।
মালকি বলেন, তথ্যপ্রমান উপস্থাপন সাপেক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা এখন আমাদের জন্য কোন কঠিন কাজ নয়। কারণ ইসরাইলি আগ্রাসনের নমুনা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা যে কেউ দেখতে পারেন এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবেন। ইসরাইল যে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন করেছে তা দিবালোকের মতো পরিস্কার।
অবশ্য ইসরাইলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সাধারণ নাগরিকের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তাদের পক্ষ থেকে সর্বত্র চেষ্টা করা হয়েছে। ইসরাইলের আরও অভিযোগ, সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে হামাস তাদের অপতৎপরতা চালিয়েছে এবং ইসরাইলের জনবহুল অঞ্চলগুলোতে রকেট হামলা চালিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২৮ দিনের আগ্রাসনে ইসরাইল শুধু সাধারণ ফিলিস্তিনি জনবসতিতেই নয়, জাতিসংঘ পরিচালিত একাধিক স্কুলে আগে থেকেই তথ্য জানার পরও নারকীয় হামলা চালিয়ে অর্ধশতাধিক সাধারণ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হত্যা করেছে। আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি হাসপাতালগুলোও। বিভিন্ন হাসপাতালে হামলা চালিয়ে অনেক মানুষকে হত্যা করেছে যায়নবাদী ইহুদী সেনারা। এমনকি ইসরাইলি আগ্রাসনে খোদ জাতিসংঘের ৮ কর্মকর্তা এবং কমপক্ষে ১০জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
এমনই প্রেক্ষাপটে গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে ইসরাইল নিজেদের মুক্ত রাখতে যেসব যুক্তি প্রদর্শন করছে তা বিশ্ববাসীর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে সেটাই দেখার বিষয়। তবে বিশ্ববিবেককে পায়ের তলায় পিষ্ট করে মার্কিন মদদে ইসরাইল যে তাদের আগ্রাসী থাবা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবে সে ব্যাপারে সচেতন মানুষ অনেকটাই নিশ্চিত।
ঢাকা, ৬ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি





