যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ক্ষমতা গ্রহণের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার গৃহীত অনেক নীতি থেকে সরে আসতে শুরু করেছে নতুন মার্কিন প্রশাসন। তার এই নীতির কারণে ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি এখন সবচেয়ে বেশি হুমকিতে।

ওবামা প্রশাসন ক্ষমতার শেষ লগ্নে এসে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল একটু চটেছে। তাদের আশ্বস্ত করতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইসরাইলের এত বিরোধিতা কেন?

কারণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আধিপত্য বজায় রাখতে ইরানই এখন ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বাধা। তাই ইরানের সব কিছুতেই বিরোধিতা করা ইসরাইলের নিয়মিত কাজ হয়ে পড়েছে। সমঝোতায় পৌঁছনোর আগে পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টা করেছিল ইরান। কিন্তু ছয় জাতিগোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা হওয়ার পর পরমাণু বোমা বানানোর সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে ইরানের। এই দাবি করেছেন সদ্য বিদায় নেয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।

সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে দেয়া বক্তৃতায় জন কেরি দাবি করেন, কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনেই হাইরেজিলিউসন ইউরেনিয়াম নিয়ে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ইরানের হাতে উঁচুমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল, যা দিয়ে ১০ থেকে ১২টি পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব ছিল। কিন্তু ইরানের সম্মতি ও সমঝোতার পর তারা এই কর্মসূচি থেকে পিছু হটেছে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ যেখানে বলেছে, ২০০৩ সালের পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কখনোই সামরিক দিকে মোড় নেয়নি। সেখানে চূড়ান্ত সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

কিন্তু এসব কথা পাত্তা দেয়নি ইরান। তারা বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করে গেছে। বরং ইরানে সৃষ্ট কিছু গোলযোগের পেছনে বিদেশীদের মদত রয়েছে অভিযোগ করে আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে সবাইকে এসব থেকে নীরব থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কটের ফলাফল সারা বিশ্বের ওপর পড়তে পারে।

এ অবস্থায় সমস্যা সমাধানে বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন রুহানি। তিনি বলেন, আজকের বিশ্বে আঞ্চলিক কোনো সমস্যা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তার প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য অংশেও শিগগিরই ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, কয়েকটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কয়েকটি দেশের হস্তপে এবং সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের প্রতি মেকি দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে দু’টি প্রধান চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরো বলেন, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশগুলোর উচিত হবে না আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর তাদের মতামত চাপিয়ে দেয়া। সিরিয়া যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থান এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনেক মজুবত করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দেশটি। রাশিয়া জোটের অন্যতম অংশীদার হওয়ায় সৌদি আরবের সাথে ইরানের স্নায়ু উত্তেজনা বেড়েছে।

প্রতিবেশী ইসরাইল আমেরিকাকে পাশে রেখে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। এসবে কর্ণপাত না করে ইরান চলছে একক লক্ষ্যে। যে লক্ষ্য তারা স্থির করেছিল দেশটিতে ইসলামি বিপ্লবের পর।

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের মাত্র দুই মাস পর দেশটিতে ৩০ মার্চ এক ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটের মাধ্যমে ইরানের জনগণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পে রায় দিয়েছিলেন। জনগণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র চায় কি না জানতে চেয়ে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়। এতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এরপর ১ এপ্রিল ১৯৭৯ ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছরের ১ এপ্রিল ইরানে পালিত হচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র দিবস।

ঐতিহাসিক ওই গণরায়ের মধ্য দিয়ে ইরানে রাজতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হয় এবং ইরানের জন্য রাজতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য প্রত্যাখ্যান করে।

এর পর থেকে বিশ্ব মঞ্চে ইরানের অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী হয়েছে। এ কারণেই ইরান এখন পশ্চিমাদের মাথাব্যথার কারণ। সাম্প্রতিক কালে নেয়া দেশটির কিছু পদক্ষেপ মুসলিম বিশ্বেও কিছুটা সমালোচিত হয়েছে। তবে এ কথাও সত্যি, ইরানের অবস্থান শক্তিশালী না হলে মধ্যপ্রাচ্যে ঠিক এই সময়টায় ইসরাইলের গর্জনে প্রতিবেশীদের টিকে থাকা অনেক কষ্ট হতো।

মাহমুদ