মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দেশটির সরকারকে বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে দাবি করেছে লন্ডনভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।

দি ইসলামিক হিউম্যান রাইটস কমিশন (The Islamic Human Rights Commission -IHRC) গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটি দাবি করেছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এর অব্যবহিত আগে ও পরে সরাসরি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এমন রোহিঙ্গাদের দেয়া তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জোরালোভাবে সুপারিশ করা হয়েছে যাতে নেদারল্যান্ডের হেগে স্থাপিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে (International War Crimes Tribunal) মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

আইএইচআরসি’র পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন তৈরির আগে বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করা হয়। সেখানে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজনের সাক্ষাতকার গ্রহণ এবং তাদের দেয়া তথ্য-উপাত্ত রেকর্ড করা হয়।   

নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া সাক্ষাতকার ও তথ্য-উপাত্তের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার সরকার যে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতা চালিয়েছে তার প্রমাণ আইএইচআরসি পেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইএইচআরসি যে ২২ জনের পৃথক পৃথক সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছে তার মধ্যে ১৯ জনই বলেছেন যে তাদের নিকট আত্মীয় অথবা পরিচিতজনকে মিয়ানমার সেনারা হয় খুন অথবা মারাত্মকভাবে যখম করেছে।   

একজন সাক্ষাতকারদাতা হিসেব করে বলেছেন যে শুধুমাত্র তার গ্রামেই ৪ শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে।  

অপর এক সাক্ষাতকার প্রদানকারী বলেছেন, তার মাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া নিজের বাবাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন আরেক সাক্ষাত প্রদানকারী রোহিঙ্গা।  

অপরাপর যারা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন তারা কেউ মাইন বিস্ফোরণে আবার কাউকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।

সাক্ষাতকার প্রদানকারীদের মধ্যে তিনজন দাবি করেছেন যে তাদের গ্রামগুলোতে নারীদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক যে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে সে মর্মে এরইমধ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন যেসব বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তার সাথে আইএইচআরসি’র দেয়া প্রতিবেদনের মিল রয়েছে বলেও দাবি সংগঠনটির।

গণহত্যা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেশনে (Genocide Convention) যেসব দেশ স্বাক্ষর করেছে তার মধ্যে মিয়ানমারও একটি। এই কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এই কনভেশনের আলোকে মিয়ানমার গণহত্যা বন্ধ করতে এবং এরই মধ্যে সংগঠিত অপরাধের বিচার করতে বাধ্য।

অবশ্য মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে অদ্যবদী সংগঠিত অপরাধ অস্বীকার করা হচ্ছে। উল্টো তারা দাবি করছে যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেসব   পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাস দমনের জন্যই করা হয়েছে।

আর  এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court -ICC)- এর বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। কারণ রাষ্ট্র যখন এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে অনীহা প্রকাশ করে কিংবা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়ে তখনই আইসিসি’র এগিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।  

আইএইচআরসি’র প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গণহত্যার দায়ে কারো বিচার করতে হলে যেই তিনটি উপাদান থাকার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে তার সবগুলোই রোহিঙ্গাদের বেলায় প্রযোজ্য।

প্রথমত, তারা একটি জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায়। দ্বিতীয়ত,  মিয়ানমার সেনারা রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে কিংবা যেভাবে জবরদস্তিমূলক তাদেরকে দেশছাড়া করছে এবং এই সম্প্রদায়ের লোকদের জন্মহার রোধে যে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে তা গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণরুপে কিংবা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে মিয়ানমার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা সুস্পষ্টরুপে গণহত্যার শামিল।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে যেসব সংস্থা কাজ করছে তাদের জন্য করণীয় নির্ধারনে আইএইচআরসি‘র দেয়া এই সবশেষ গবেষণা প্রতিবেদন  সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে করছেন সংস্থাটির নীতিনির্ধারকরা।  

এর আগে গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত তথ্য-উপাত্তের বরাত দিয়ে মানবাধিকার বিষয়ক আসিয়ানের সংসদীয় কমিটি (ASEAN Parliamentarians for Human Rights -APHR)- প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত বছরের গ্রীষ্মকালে শুরু হওয়া মিয়ানমারের অরাজকতায় প্রায় ৪৭ হাজার বাবা-মা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।  

শুধু গত বছর থেকেই নয় ২০১৬ সালের পূর্বেও বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর যেসব বর্বরতা ও গণহত্যা চালিয়েছিল তার বহু তথ্য-উপাত্ত অনেক মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা সময়ে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে, মিয়ানমার সরকারকে তার দেশে সংগঠিত গণহত্যা ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আগামী ২৭ জুলাই পর্যন্ত যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

বিগত ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে গণহত্যা ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে এ যাবত বাংলাদেশে যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন তাকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা (UN Commissioner for Human Rights) জাতিগত নিধনযজ্ঞের বড় আলামত (a textbook example of ethnic cleansing) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

আইএইচআরসি’র প্রতিবেদনে আরো সুপারিশ করা হয়েছে যে, মিয়ানমার যেহেতু তার অপরাধ স্বীকার করতে কিংবা সুষ্ঠু তদন্ত করতে রাজি নয়, তাই জতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council) রোম স্ট্যাচু’র (Rome Statute) ১৩(২) ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি’কে দায়িত্ব দিতে পারে মিয়ানমারকে বিচারের কাঠগড়ায় আনার ব্যাপারে।