মঙ্গলবার (ঢাকা) সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে সারাদেশে প্রায় ২০০ জনের বেশি পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ইভার্স ইজাবস বলেন, “এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাস্তব ও কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দেশজুড়ে পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।”

৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক মাঠে

ইইউ প্রধান জানান, মঙ্গলবার থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইইউ ইওএম) ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক (এসটিও) মাঠে নামিয়েছে। এসব পর্যবেক্ষক নির্বাচনের দিন দেশের ৬৪টি জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।

তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে— ভোটকেন্দ্র সময়মতো খোলা, ভোটগ্রহণের সার্বিক পরিবেশ, ভোটকেন্দ্র বন্ধের প্রক্রিয়া, ব্যালট গণনা এবং ফলাফল তালিকাভুক্ত করার পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই ইইউ তাদের মূল্যায়ন ও প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে।

দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতা

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকের মোতায়েন মূলত আগেই নিযুক্ত ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের কাজেরই ধারাবাহিক অংশ। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করে নির্বাচনি পরিবেশ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রচার-প্রচারণা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।

ইভার্স ইজাবস বলেন, “স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকদের কাজের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনের দিন মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবেন। এতে করে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি সমন্বিত মূল্যায়ন সম্ভব হবে।”

আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় শক্তিশালী মিশন

ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনকে আরও শক্তিশালী করতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দলও এতে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক মিশন থেকে স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৫ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক মিশনে কাজ করছেন।

এ ছাড়াও কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের পর্যবেক্ষকরাও ইইউ মিশনে যোগ দিয়েছেন। পূর্ণ সক্ষমতায় এই মিশনে ২০০ জনেরও বেশি পর্যবেক্ষক কাজ করছেন, যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আগত।

ইভার্স ইজাবস বলেন, “এই বহুজাতিক উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি।”

প্রাথমিক প্রতিবেদন ১৪ ফেব্রুয়ারি

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এই প্রতিবেদনে নির্বাচনের দিনসহ সামগ্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হবে।

নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশসংবলিত একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে। প্রাথমিক ও চূড়ান্ত— উভয় প্রতিবেদনই সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

নিরপেক্ষতা ও আচরণবিধি

ইভার্স ইজাবস স্পষ্ট করে বলেন, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন একটি কঠোর আচরণবিধির অধীনে পরিচালিত হয়। এই আচরণবিধি অনুযায়ী মিশনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে হয় এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হয়।

তিনি জানান, মিশনটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালা অনুসরণ করেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি পেশাদার, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন তুলে ধরা।

প্রসঙ্গত, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ইইউসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমএম