সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে মুফতিরা বলেন, অনতিবিলম্বে কুরআনবিরোধী এ আইন বাতিল না করলে সরকারকে চরম খেসারত দিতে হবে।

তারা বলেন, হেবা তথা দানের ক্ষেত্রে দানকারী যদি দানকৃত সম্পত্তি নিজের ভোগদখলে রাখার অধিকার সংরক্ষণ করেন এবং মৃত্যুর পর তা কার্যকর হয়, তাহলে বিষয়টি মূলত মিরাসি সম্পত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়। অথচ মিরাসি সম্পত্তিতে আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত ওয়ারিশরা নির্ধারিত অংশ পাবেন। সেখানে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।

মুফতিদের বিবৃতিতে বলা হয়, হেবা করার পর ওই দানকৃত সম্পত্তি দাতা কর্তৃক ভোগ করার ক্ষেত্রেও শরিয়তে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বরং বোখারি ও মুসলিম শরিফসহ সহিহ হাদিসের কিতাবে বলা হয়েছে, ‘দান করে ওই সম্পদ যদি কেউ ফেরত নেয়, তাহলে সে ওই কুকুর, যে কুকুর নিজের বমি নিজে খায়।’

ওসিয়তের ক্ষেত্রেও শরিয়তে নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি ওসিয়ত করা যায় এবং কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা যায় না। সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মহান আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অতএব কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা যাবে না।’

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলিম। মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে হেবা, মিরাস ও ওসিয়তের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সম্পত্তি দানসংক্রান্ত নতুন কোনো আইন বা বিধান প্রণয়নের সময় ইসলামী শরিয়াহর প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা ইসলামী আইনের হেবা (দান), মিরাস (উত্তরাধিকার) এবং ওসিয়ত (Will/Bequest) -এই তিনটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থার মধ্যকার সীমারেখা ও শর্তাবলির আলোকে গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহগত প্রশ্নের উদ্রেক করে।

বিভিন্ন ফতোয়া ও মতামতের উল্লেখ

বিবৃতিতে সৌদি আরবের আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহূস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতার ১১০৮৭ নম্বর ফতোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া International Union of Muslim Scholars (IUMS)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মতামতের উল্লেখ করে বলা হয়, সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং কোনো উত্তরাধিকারীর ক্ষতি না করার বিষয়টি সেখানে সুস্পষ্টভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ার উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সব সম্পত্তি হেবা করে দেওয়া গুনাহের কাজ।

মুফতি আব্দুল মালেকের ফতোয়া

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ বিষয়ে ফতোয়া চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আব্দুল মালেক ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ফতোয়া প্রদান করেন।

ফতোয়ায় বলা হয়, ‘এ ধরনের হেবার হুকুম যা-ই হোক না কেন, যেহেতু এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত মিরাস বণ্টননীতিকে এড়িয়ে যাওয়া, তাই এ ধরনের হেবা স্পষ্ট হারাম।’

ফতোয়ায় আরও বলা হয়, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন- এমন কোনো উত্তরাধিকার বাতিল করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল করে দেন।’ -সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, পৃ. ১১৮, হাদিস ২৮৫; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খণ্ড ১৬, পৃ. ২১৫, বর্ণনা ৩১৬৬৮।

ফতোয়ার দ্বিতীয় বক্তব্যে বলা হয়, নিজের জীবদ্দশায় এমনভাবে হেবা করা, যা হেবাকারীর মৃত্যুর পর কার্যকর হবে—এটির নাম হেবা হলেও লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় এটি ওসিয়ত। অথচ ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম ও বাতিল।

তবে সব ওয়ারিশ প্রাপ্তবয়স্ক হলে এবং তারা স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ওই ওসিয়ত বাস্তবায়ন করে দিলে তা ভিন্ন বিষয় বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য ওসিয়ত নেই।’ -জামে তিরমিযি, হাদিস ২১১৭; কিফায়াতুল মুগতাদি, খণ্ড ১১, পৃ. ৪১০।

বিবৃতিতে বলা হয়, হাদিস ও ফিকহের অনেক ইমাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, এ হাদিসে যে বিধান দেওয়া হয়েছে, তা ইসলামী শরিয়তের মুজমা আলাইহি (ইজমাসম্মত) বিধান। এ বিধান রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাওয়াতুর সূত্রে প্রমাণিত। অর্থাৎ এটি সাধারণ কোনো সহিহ হাদিস নয়; বরং মুতাওয়াতির হাদিস, যা প্রত্যাখ্যান করা মানে কুরআনের হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করা।

আইন বাতিলের দাবি

মুফতিরা বলেন, আইনটি বাতিল করে দেশের স্বীকৃত মুফতি, ইসলামী আইনবিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইনবিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে এর বিস্তারিত শরিয়াহ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিষয়টির ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, পারিবারিক সম্পত্তির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত বিধানটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পুনঃপর্যালোচনা করা জরুরি।

দেশের শীর্ষ মুফতিগণ সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী দাবি করে তা বাতিলের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

তারা বলেন, সরকার আসে, সরকার যায়; ইসলামিক বিধান নিয়ে ষড়যন্ত্র ও তামাশা করে কেউ কোনোদিন টিকে থাকতে পারে না। তাই অবিলম্বে সরকারকে কুরআনবিরোধী এ আইন বাতিল করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হবে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী মুফতিরা

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের আমির ও সম্মিলিত উলামা সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী; জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন; বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ড ও সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী; জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুফতি আবু জাফর কাসেমী; ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি ড. মুফতি মাওলানা আব্দুস সামাদ; বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ড. সামিউল হক ফারুকী; মুফতি আলী হাসান ওসামা; মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী; শায়খ সাইফুল্লাহ নোমানী; খতিব ও পরিচালক, আল-আমিন জামে মসজিদ ও মাদরাসা, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা, মুফতি শফিকুল ইসলাম বিন বাহাউদ্দিন; বেফাকুল মাদারিস বাংলাদেশের মুফতি আবু দাউদ জাকারিয়া; মুফতি আবুল কাশেম গাজী; মুফতি আব্দুল আউয়াল; মুফতি মুজিবুর রহমান হামিদী, প্রধান মুফতি, মাদরাসা নুরিয়া ঢাকা; মুফতি সুলতান মহিউদ্দীন, ইফতা বিভাগ, মাদরাসা নুরিয়া ঢাকা; মুফতি আবুল কালাম, মুহতামিম, মিরপুর জামিয়া; মুফতি বরকত উল্লাহ আনসারী, খতিব ও প্রিন্সিপাল, বাইতুল মেরাজ জামে মসজিদ ও মাদরাসা, ঢাকা; খতিব, সাবার জামে মসজিদ; মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুহতামিম, বাইতুল আজিজ মাদরাসা, কামরাঙ্গীরচর; মুফতি আবুল কাশেম কাসেমী; মুফতি কবির আজহারী, খতিব, বিশ্বরোড জামে মসজিদ; মুফতি ইসমাইল হোসাইন; প্রফেসর মুফতি আ.ন.ম. রশিদ আহমাদ মাদানী; ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফী; হক্কানী পীর মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব মুফতি মাওলানা শাহ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দীকি; খেলাফাতে রব্বানীর আমির মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী; মুফতি মহিউদ্দিন, খতিব, আদর্শ নগর জামে মসজিদ, ঢাকা; মুফতি সরফুল ইসলাম, খতিব, আফতাব নগর জামে মসজিদ; মুফতি ড. জাকারিয়া নূর; মুফতি লুৎফর রহমান, খতিব, পল্টন জামে মসজিদ; মুফতি ইব্রাহিম খলিল, টঙ্গী; অধ্যক্ষ মুফতি মিজানুর রহমান, খতিব, আনোয়ারা খাতুন জামে মসজিদ, ঢাকা; অধ্যাপক মুফতি শফিকুল ইসলাম, খতিব, আবহাওয়া কোয়ার্টার জামে মসজিদ, উত্তরা, ঢাকা; মুফতি আব্দুল কুদ্দুস, খতিব, খালাসী জামে মসজিদ, খুলনা; মুফতি অধ্যক্ষ রাহমাতুল্লাহ, খতিব, নেসারিয়া জামে মসজিদ, খুলনা; মুফতি অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, খতিব, বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ, খুলনা; মুফতি মোস্তাফিজুর রহমান; মুফতি জাহিদুর রহমান, খতিব, চাঁদনী চক জামে মসজিদ, ঢাকা; পীর মুফতি মাওলানা শরীফ হোসাইন; মুসলিম জনতা পরিষদের আমির মুফতি মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ; হক্কানী ত্বরীকত মিশনের জেনারেল সেক্রেটারি মুফতি আল্লামা মুস্তাক আহমাদ; জমিয়াতে উলামা দেওবন্দ পরিষদের সেক্রেটারি হযরত মুফতি মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক কাসেমী; মীরের সরাইয়ের পীর সাহেব মুফতি মাওলানা আঃ মোমেন নাছেরী; টেকেরহাটের পীর সাহেব মুফতি মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী; অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা মোশাররফ হোসাইন; মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার; গাউছিয়া দরবার শরিফের পীর মুফতি ড. আব্দুল কাইউম আল-আযহারী; বিশিষ্ট মুফাসসির মুফতি মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমাদ; মুফতি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী; মুফতি মাওলানা মো. নূরুল আমীন; মুফতি ড. কামরুল হাসান শাহীন; মুফতি ড. সাইফুল ইসলাম রফিক, প্রিন্সিপাল, মুহাম্মাদাবাদ ফাজিল মাদরাসা; জাতীয় খতিব পরিষদের আমির মুফতি মাওলানা মাউদুর রহমান; হুফ্ফাজ পরিষদের সেক্রেটারি মুফতি মাহবুবুর রহমান; মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী; কওমী হাফেজ পরিষদের সভাপতি মুফতি নূরুল আমিন গোপালগঞ্জী হুজুর; সম্মিলিত ইসলামিক জোটের আমির মুফতি মাওলানা আবদুল বাকি; ইসলামী জনতার সভাপতি মুফতি আবদুল কুদ্দুস; মহাসচিব হাফেজ মুফতি আবুল কাসেম; মুহাদ্দিস আবু বকর সিদ্দিক; ইসলাহুল উম্মাহর সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু হানিফ নেছারী; মুফতি ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী; মুফতি মাওলানা ইরশাদুল্লাহ আল-আযহারী; মুফতি মাওলানা আবু নাঈম; মুফতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খতিব, আজাদ মসজিদ, গুলশান; মুফতি মাওলানা সাদিক মুহাম্মাদ ইয়াকুব আল-আযহারী প্রমুখ।

এনএইচ