যশোরের পল্লীতে পুলিশের ‘সহায়তায়’ দুর্বৃত্তরা বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছে। তারা আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে একটি রাইস মিলের চাতালে থাকা কয়েক শ’ বস্তা চাল। গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাড়িঘরের আসবাবপত্র। লুটে নিয়েছে মূল্যবান মালামাল।
শনিবার রাতভর এই তাণ্ডব চলে। তবে এই নারকীয়তা পুলিশের সহায়তায় ঘটেনি বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি।
ঘটনার জন্য দায়ী দুর্বৃত্তদের না ধরলেও পুলিশ ক্ষতিগ্রস্ত রাইস মিলটির মালিককে ধরে এনেছে বলে অভিযোগ করেছেন তার ভাই। আটক খোরশেদ আলম ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। তবে ইউপি চেয়ারম্যানকে আটকের কথা স্বীকার করেনি পুলিশ।
রুমা রাইস মিলের কয়েকজন শ্রমিক জানান, শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে দু’টি মাইক্রোবাস এবং দু’টি প্রাইভেটকারে চড়ে একদল ব্যক্তি চাতালের সামনে আসে। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদেরও দেখা যায়। দুর্বৃত্তদের মুখ বাঁধা ছিল।
শ্রমিকরা জানান, দুর্বৃত্তদের মধ্য থেকে চারজন প্রাচীর টপকে প্রথমে রাইস মিলের ভেতরে ঢোকে। এরা চাতালে বসবাসরত সাত শ্রমিক পরিবারকে ঘুম থেকে ডেকে দশ মিনিট সময় বেঁধে দেয় পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে যেতে। এরপর দুর্বৃত্তরা দু’টি বালতিতে পেট্রোল নিয়ে এসে চাতালে ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় দুর্বৃত্তরা চাতালের চেয়ার, টেবিল এবং আবাসিক শ্রমিকদের ঘরের আববাবপত্রও ভাংচুর করে।
চাতালের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সেখানে প্রায় আট হাজার বস্তা চাল বিক্রির জন্য মজুদ ছিল। আগুনে এর অর্ধেক পুড়ে গেছে। বাকি অর্ধেকের মধ্যেও বেশ কিছু পেট্রোলে নষ্ট হয়েছে এবং কিছু লুটপাট হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে এলাকাবাসী ছুটে এলে পুলিশ এবং দুর্বৃত্তরা তাদের প্রথমে চাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। খবর পেয়ে যশোর থেকে ফায়ার ব্রিগেডের ইউনিট গেলেও তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে এলাকাবাসী একযোগে ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভায়।
চাতাল শ্রমিক শিল্পী খাতুন জানান, ‘দুর্বৃত্তরা আমাদের দৌড়ে পালানোর নির্দেশ দিয়ে বলে না পালালে পুড়ে মরবি, আটক হয়ে যাবি। ভয়ে আমরা চাতালের পাশের ফাঁকা মাঠের একটা পেঁপে বাগানে আশ্রয় নিই। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সারারাত এই বাগানে ছিলাম। আমার দু’টি বাচ্চা আছে খুবই অসুস্থ। শীতে তারা মরার মতো হয়ে গেছে।’
মিলের লেবার সরদার বজলুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে পুলিশ এসে আমাদের বের করে দেয়। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর আমরা পেঁপে বাগান থেকে দেখতে পাই মিলের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত মিলের মালিক ইউপি চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের ছোট ভাই সিফায়েত হোসেন মোহন বলেছেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই বলা যাবে না। তবে মিলে বিক্রির জন্য প্রায় আট হাজার বস্তা মিনিকেট চাল ছিল। এর মধ্যে ৬-৭ শ’ বস্তা আগুনে পুড়ে গেছে।’

যশোর সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন অভিযোগ করেছেন, পুলিশের সহায়তা নিয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এর আগে পুলিশ খোরশেদ চেয়ারম্যানের ভাই সিফায়েত হোসেনের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের বাড়ি হামলা করে। পুলিশ এই বাড়ির আসবাবপত্র ভাংচুর করে এবং পবিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করে।
সাজ্জাদ আরও অভিযোগ করেছেন, পুলিশ একই রাতে সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে বিএনপি নেতাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে।
যশোর সদরের বড় মেঘলা গ্রামের বাসিন্দা ও চাঁচড়া ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মনিরুজ্জামানের পুত্রবধূ জোহরা অভিযোগ করেন, রাত ৩টা-সাড়ে ৩টার দিকে ৫০-৬০ জনের একদল সন্ত্রাসী সশস্ত্র অবস্থায় তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা বাড়িতে থাকা একটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে এবং নগদ ৫০ হাজার টাকা ও তিন ভরি সোনার অলঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়।
বড় মেঘলা গ্রামের ঈমান আলীর তিন ছেলে ও বিএনপিকর্মী সাহেব আলী, আল মামুন এবং ইউসুফ আলীর বাড়িতে রাত ৩টার দিকে প্রায় ৫০ জনের একদল সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন সাহেব আলীর স্ত্রী রুনা লায়লা।
তিনি অভিযোগ করেন, এ সময় হামলাকারীদের সঙ্গে পোশাকধারী পুলিশ সদস্যদেরও দেখা গেছে। হামলাকারীরা সাহেব আলীর ঘর থেকে ধান বিক্রি করার নগদ এক লাখ টাকা লুট করে। এ ছাড়া সাহেব আলী ও তার ভাই আল মামুনের বাড়ি থেকে সাত ভরি সোনার অলঙ্কার লুট করে দুর্বৃত্তরা।
রুনা লায়লা বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা পুলিশের সামনে তিন ভাইয়ের ঘরের অন্যান্য মালামাল লুট করে। ঘরের টিভি, ভিসিডি, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, চেয়ার, ডাইনিং টেবিল ভাংচুর করে। ঘর থেকে লেপ-তোষকসহ কাপড়-চোপড় বাইরে বের করে এনে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়।’
রুনা লায়লা অভিযোগ করে বলেন, ‘হামলাকালে সন্ত্রাসীরা আমার চতুর্থ শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে তালহা জুবায়ের এবং নবম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে অন্তুসহ আমাদের তিনজনকে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মারারও হুমকি দেয়। এতে আমার সন্তানরা চরম ভীতির মধ্যে রয়েছে।’
তিনি প্রশ্ন করেন, মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু পুলিশ পাহারায় এভাবে সন্ত্রাসী হামলা হলে মানুষ যাবে কোথায়?
সন্ত্রাসীরা ওই রাতে বড় মেঘলা গ্রামের বিএনপিকর্মী আবদুল মজিদের বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ভাংচুর এবং লুটপাট করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই পরিবারের সদস্যরা।
এ সব বিষয় নিয়ে সকাল ১১টায় যশোর কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ ইনামুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাই তাই নাকি? আমি তো এ সব কিছু জানি না। আমার ডিউটি বসুন্দিয়া রোডে, আমি সেখানে আছি।’
ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ মামুনুর রশিদ বলেন, ‘এটা সদর উপজেলার মধ্যে পড়ে। আমি কিছু বলতে পারি না।’
যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) মিলু মিয়া বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে নাই। রাতে ঘটনা ঘটেছে। আমি সেখানে যাইনি বা যে সব পুলিশ সদস্য সেখানে গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গেও আমার কথা হয়নি। বিষয়টি তদন্ত করে জানাতে পারব।’
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ঘরবাড়িতে আগুন, অশ্লীল ব্যবহার, মারপিট বিষয়ে জানতে চাইলে মিলু মিয়া বিশ্বাস বলেন, ‘আমি শুনেছি কে বা কারা রাতের অন্ধকারে এ সব করেছে। তবে সব বিষয় তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না।’
এদিকে, সরেজমিন পরিদর্শনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে কোনো পুরুষ মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিবারের নারীরা জানিয়েছেন, ‘সন্ত্রাসী আর পুলিশের ভয়ে বাড়ির পুরুষ মানুষ আত্মগোপনে রয়েছেন।’
শনিবার রাতের ওই ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক নেমে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ছাড়াও এলাকার বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত পরিবারগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সূত্র: দ্য রিপোর্ট
জেএ





