সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে শিশুদের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করতে আজ বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদরদপ্তর থেকে পাঠানো এক প্রেস বার্তায় এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও পুলিশের অবস্থান পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, সম্প্রতি গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। তবে অধিকাংশ প্রতিবেদনে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে কতজন উদ্ধার হয়েছে কিংবা পরবর্তীতে পরিবারে ফিরে এসেছে—সে সংক্রান্ত কোনো হালনাগাদ তথ্য ছিল না। ফলে নিবন্ধিত জিডির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত খবরগুলোতে বাস্তবে শিশু নিখোঁজের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠেনি, যা সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।

জনমনে এই উদ্বেগ দূর করতে পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশে সারা দেশে স্থানীয় থানাগুলোর মাধ্যমে প্রতিটি সাধারণ ডায়েরির তথ্য নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। এই মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের পরই শিশু উদ্ধারের প্রকৃত পরিসংখ্যান উঠে আসে।

পরিসংখ্যান ও বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিখোঁজ শিশুদের বয়সকে প্রধানত দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

  • ০ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু: চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এই বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় মোট ৪৭৪টি জিডি নথিভুক্ত হয়। সমন্বিত অনুসন্ধানের পর এর মধ্যে ৪০৬ জন শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে এই বয়সী ৬৮ জন শিশু নিখোঁজ রয়েছে।
  • ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোর: এই বয়সসীমায় নিখোঁজের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এই বয়সের শিশু-কিশোর নিখোঁজের ঘটনায় সারাদেশে ১৫ হাজার ২৪৩টি জিডি করা হয়। এর মধ্যে পুলিশি তৎপরতা ও পরিবারের সহায়তায় ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো ১ হাজার ৯৭০ জন কিশোর-কিশোরীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সামগ্রিক তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া শিশুদের ৮৭ শতাংশই সফলভাবে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে বা উদ্ধার করা হয়েছে।

নিখোঁজের কারণ ও প্রেক্ষাপট পুলিশ সদরদপ্তরের বিশ্লেষণে দুই ভিন্ন বয়সসীমার শিশুদের বাড়ি ছাড়া বা পথ হারানোর পেছনে পৃথক কিছু সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

ছোট বয়সের (০-৯ বছর) শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত অসচেতনতা ও দিকভুল হওয়াই মূল কারণ। পরিবার বা স্বজনদের সাথে কোনো অচেনা জায়গায় বেড়াতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা, স্থায়ী ঠিকানা বা অভিভাবকদের নাম-ফোন নম্বর সঠিকভাবে বলতে না পারা কিংবা হঠাৎ একা একা বাসা থেকে বের হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়া—এ ধরনের ঘটনার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক মানসিক দ্বন্দ্ব বড় ভূমিকা রাখে। পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, পরিবারের প্রতি অভিমান, পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধুদের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ে। এছাড়া কিশোর বয়সে অনিয়ন্ত্রিত ও স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্কের টান এবং অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক বা পারিবারিক শাস্তির ভয়ে পালিয়ে থাকার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের কাছ থেকে টাকা-পয়সা বা অন্য কোনো দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবেও আত্মগোপনে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

অনলাইন জিডি ও বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি (Online GD) ব্যবস্থা চালু করায় যেকোনো সাধারণ নাগরিক ঘরে বসেই দ্রুত জিডি করার সুবিধা পাচ্ছেন। ডিজিটাল এই প্রক্রিয়ার ফলে পুলিশি খাতায় নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি নিবন্ধনের হার আগের তুলনায় বহুলাংশে বেড়েছে।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের দেওয়া বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সারা দেশে নিখোঁজ সংক্রান্ত মোট জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৪১৪টিতে। তবে ২০২৫ সালে তা একলাফে বেড়ে ২২ হাজার ৫৫০টিতে পৌঁছায়। ২০২৬ সালের চলমান ধারাবাহিকতায় সাত মাসেই এই সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে, যার পেছনে সচেতনতা বৃদ্ধি ও অনলাইন সুবিধার বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ।

নিখোঁজ থাকা বাকি ১৩ শতাংশ শিশুকে উদ্ধার এবং তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।