‘বস, ফিনিশ্ড।’ ‘তোমরা কোথায়?’ ‘এ মুহূর্তে ডিওএইচএস।’ ‘ওকে, দ্রুত সরে যাও। ওই নম্বরে কল দিও, কথা হবে।’

ইতালির নাগরিক চেসারি তাভেল্লাকে হত্যার পরপরই খুনের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহভাজন দুজন অজ্ঞাত ব্যক্তি মোবাইল ফোনে মাত্র ১৮ সেকেন্ড এসব কথা বলে।

নম্বর দুটির মধ্যে একটি বাংলালিঙ্ক (০১৯১২৬----৫২) ও অপরটি এয়ারটেলের ০১৮১৯----১৫)।

সোমবার গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২০ মিনিট পর সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিট ৪২ সেকেন্ড থেকে ৬টা ৩৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত মোট ১৮ সেকেন্ড ওই মোবাইল নম্বর দুটিতে কথা হয়।

এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সময় বাংলালিংক নম্বরের ফোনটির অবস্থান ছিল ঘটনাস্থলের আশপাশে। ১৮ সেকেন্ড কথা বলার পর থেকেই ওই মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ রয়েছে।

গোয়েন্দাদের ধারণা, কিলিং মিশন শেষে ঘাতকদের কেউ ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছিল।

সন্দেহভাজন ওই দুটি মোবাইল নম্বর শনাক্তের পর বুধবার তাদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করে সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। তবে ভুয়া রেজিস্ট্রেশনে মোবাইল সিম ব্যবহার করায় গোয়েন্দা সংস্থাটি ঘাতকদের অবস্থান নিশ্চিত হতে পারেনি।

চাঞ্চল্যকর তাভেল্লা হত্যার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাভেল্লা খুন হওয়ার আগে ও পরে কাছাকাছি সময়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের মোবাইল ফোন টাওয়ারের নেটওয়ার্কের আওতায় যারা কথাবার্তা বলেছেন তাদের মধ্যে ২২ জনকে সন্দেহের তালিকায় রেখে তারা প্রথম থেকেই অনুসন্ধান শুরু করেন। এসব গ্রাহকের কললিস্ট পর্যালোচনার পাশাপাশি তাদের পিসিআর (প্রিভিয়াস ক্রাইম রেকর্ড) খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সন্দেহভাজনদের এসব ফোনে এরই মধ্যে আড়িপাতা হয়েছে। তবে সোমবার সন্ধ্যায় গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে ইতালির নাগরিক চেসারি তাভেল্লা খুন হওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর দুটি মোবাইল ফোনে সন্দেহজনক কথোপকথনের রেকর্ড হাতে আসার পর গোয়েন্দারা নড়েচড়ে বসেছেন।

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো বলেন, ফোন দুটির ‘ভয়েজ রেকর্ড’ তাদের হাতে এসেছে। তবে ঘটনার পর থেকেই মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ রয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগে একই সঙ্গে ওই সিম দুটি মিরপুর এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়। গত এক সপ্তাহে ওই দুটি মোবাইল নম্বরে ৩৮ দফা কথা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো নম্বরে ওই মোবাইল থেকে ফোন করা হয়নি।

ওই মোবাইল ফোনের রেজিস্ট্রেশনের সূত্র ধরে গোয়েন্দারা সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় খোঁজ নিলে সেখানে ওই নামে কাউকে পাননি।

এ থেকে গোয়েন্দাদের ধারণা, ঘাতকরা ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ওই সিম সংগ্রহ করেছিল। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঘাতকরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ধূর্ত প্রকৃতির।

এদিকে তাভেল্লা হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চারটি বিষয় সামনে রেখে তারা তদন্তকাজ শুরু করেছেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, জঙ্গি ও এনজিও-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ আছে কিনা সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক সশ্লিষ্টতার তদন্ত

সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসা কয়েকটি ফোনকল খতিয়ে দেখছে।

একই সঙ্গে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতার ফোনালাপের সূত্রগুলো থেকে আকার ইঙ্গিতে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কিনা সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

ওই গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে নিয়োজিতদের ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তাদের কাছে মনে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে যে আপত্তি তোলা হয়েছে এর সঙ্গে তাভেল্লা হত্যার এক ধরনের যোগসূত্র থাকতে পারে। কারণ একই সময়ে দুটি বিষয় উঠে এসেছে। আর তার পরপরই গুলশানে বিদেশী নাগরিক খুনের ঘটনা ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।

বান্ধবী নিগারকে খোঁজা হচ্ছে

নিহত চেসারি তাভেল্লার এক বান্ধবীকে খুঁজছে গোয়েন্দারা। ওই নারী ডাচ নাগরিক, তার নাম নিগার রিগ্যাল।

মঙ্গলবার চেসারি তাভেল্লার গুলশানের বাসা থেকে জব্দ করা ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন থেকে নিগার রিগ্যালের সঙ্গে তার (তাভেল্লা) ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ পেয়েছে ডিবি পুলিশ। এর সূত্র ধরেই গোয়েন্দারা তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। তবে বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত গোয়েন্দারা তার সন্ধান পায়নি।

গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, নিগার রিগ্যালকে পাওয়া গেলে তাভেল্লার ব্যাপারে কিছু তথ্য জানা যেতে পারে। বিশেষ করে তাভেল্লার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল কিনা কিংবা কেউ তাকে হুমকি দিয়েছিল কিনা সে বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করা হবে বলে গোয়েন্দারা জানান।

নজর এনজিও ‘আইসিসিও’র কার্যক্রমে

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চেসারি তাভেল্লা ‘আইসিসিও বিডি’ নামে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক যে এনজিওতে কাজ করতেন ওই প্রতিষ্ঠানে অনুদানপ্রাপ্তিসহ প্রজেক্টভিত্তিক আনুষঙ্গিক বিষয়াদিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই এনজিওটি সর্বশেষ কবে কী পরিমাণ তহবিল পায় এবং এর কত অংশ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে তাও খুঁজে দেখা হচ্ছে। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে এমন কোনো বিষয়কে তারা সন্দেহের বাইরে রাখছেন না।

চেসারি তাভেল্লা যে এনজিওর কর্মী সেই সংস্থার গোড়ার খবরও নিচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে সংস্থাটির কর্মকাণ্ডও।

খুনীদের ধরতে ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কূটনীতিক পাড়ার সব কটি পয়েন্টের সিসি টিভির ফুটেজ হাতে নেয়া হয়েছে। ওই সব ফুটেজে অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি মোটরসাইকেলকে যাতায়াত করতে দেখা যায়। এর মধ্যে পাঁচটি মোটরসাইকেলকে সন্দেহের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আনা হয়েছে।

এই পাঁচটি মোটরসাইকেলের মধ্যে খুনিদের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল শনাক্ত হতে পারে বলে আশা করছেন তদন্তে নিয়োজিত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত গুলশানের চেকপোষ্টগুলোতে একাধিক আরোহী থাকলে মোটরসাইকেল থামানো হয়। খুনিদের সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলটি আসলে কোন চেকপোস্ট ভেদ করে এসেছে, কোন ভবনের ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ছায়া তদন্তকারী সংস্থা র্যা বের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে কোন সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেল দুটি বেরিয়ে গেছে এর খোঁজ করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছি। সেই প্রযুক্তির সঙ্গে কয়েকটি ক্লু মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে সহায়তা কমিটি

চেসারি তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাকার ডিবি পুলিশের ডিসি (পূর্ব) মাহবুব আলমকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিতে ডিবির চারটি জোনের (উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি), সহকারী কমিশনার (এসি) ও পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

বুধবার সকালে কমিটি গঠনের পর দুপুরে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় কমিটির সদস্যরা আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন।

এদিকে মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তর আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি মুনতাসীরুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশের দুটি কমিটি সমন্বিতভাবে তদন্ত করছে।

জানা গেছে, তাভেল্লা হত্যার ঘটনায় তদন্তে কারিগরি সহায়তার জন্য এফবিআইও সহায়তার জন্য তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয়তা হলে এফবিআইকে জানাবে পুলিশ।

উল্লেখ্য, সোমবার সন্ধ্যায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের হেলথ ক্লাবের সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে জগিং করে গুলশান ২ নম্বরে বাসায় ফিরছিলেন ইতালির নাগরিক চেসারি তাভেল্লা। তিনি ৯০ নম্বর সড়কের মাথায় পৌঁছলে তাকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। সূত্র: যুগান্তর ও প্রথম আলো

এআই