সবশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য জুলাইয়ে একই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। পুনর্গঠনের আগে ১৫ বছরেরও বেশি সময়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ৫৭টি মামলার রায় দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর মধ্যে সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ছয়জনের। এদের মধ্যে পাঁচজন জামায়াতে ইসলামী নেতা এবং একজন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা। ২০১০ সালে গঠনের পর নানা আলোচনা ও ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
বেশ কয়েকবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী, আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট, রায়কে ঘিরে স্কাইপ বিতর্ক এবং সাক্ষীদের নিয়ে বিতর্কসহ নানা ঘটনার জন্ম হয়েছিল সেই সময়।
গত বছরের জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলার রায় হতে যাচ্ছে আজ ১৭ নভেম্বর।
এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গত বছরের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত গত এক বছরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১০টি।
আর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্তত ৩৭টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলায় শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে গুম–নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলাতেও শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন মামলা ও ঘটনার কথা চলুন জেনে আসি।
বিচারের শুরু যেখান থেকে
‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটক, গ্রেফতার, বিচার এবং সাজা দেওয়া হয়।
১৯৭৩ সালের এই আইনটি মূলত ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটর (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার ১৯৭২’-কে প্রতিস্থাপিত করেছে।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩, যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত একটি রাষ্ট্রীয় আইন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগী রাজাকার বাহিনী জনগণের প্রতি যে নৃশংসতা চালিয়েছিল, তাদের বিচারের উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে এ আইনে সংশোধনী আনে জাতীয় সংসদ।
স্বাধীনতার ৩৯ বছর পরে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা এবং আইনজীবী প্যানেল গঠন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
ঢাকার পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজ শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনের বছরই জুলাই মাসে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
শুরুর দিকে একটি ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চললেও পরে ২০১২ সালের মার্চে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার।
জামায়াত–বিএনপি নেতাদের বিচার
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিচার হয় ট্রাইব্যুনালে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
আব্দুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী, মীর কাশেম আলী, আবুল কালাম আজাদ (বাচ্চু রাজাকার), এটিএম আজহারুল ইসলাম।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড হয় আলবদর নেতা চৌধুরী মঈনউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের। এ ছাড়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়। জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার এবং আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধেও রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। এ সময়কার ৩০টি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়
জামায়াতে ইসলামীর রুকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মামলার রায়ই ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া প্রথম রায় (২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি)।
কাদের মোল্লা: রায় ও গণজাগরণ মঞ্চ
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়। সেই আপিলে ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড হয় এবং ১২ ডিসেম্বর তা কার্যকর করা হয়। এটি ছিল ট্রাইব্যুনালের প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।
কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড
২০১৩ সালের ৯ মে জামায়াতে ইসলামী নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২০১৫ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
সাঈদী—সাক্ষী সুখরঞ্জন বালির ঘটনা
দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে আপিল বিভাগ তা আমৃত্যু কারাদণ্ডে কমিয়ে দেয়। ২০১২ সালে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালির বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ হয়ে ভারতে পাওয়া যাওয়াকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ দাখিল করেন।
গোলাম আযমের বিচার
২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
তার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়।
কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় তার আপিল নিষ্পত্তিহীন থেকে যায়।
প্রথম আপিলে খালাস: এটিএম আজহারুল ইসলাম
২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড পেলেও পরে পুনর্বিবেচনা আবেদনে তিনি আপিলে খালাস পান—যা ট্রাইব্যুনালের মামলায় প্রথম খালাস।
মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ড
২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ড, ২০১৬ সালে রিভিউ খারিজ এবং একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও স্কাইপ কেলেঙ্কারি
২০১৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার আগেই রায় ফাঁস হয়েছে দাবি করে বিতর্ক তৈরি হয়—যা ‘স্কাইপ কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত। ২০১৫ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজের অপসারণ
২০১৯ সালে ‘গুরুতর অসদাচরণ’-এর অভিযোগে তাকে অপসারণ করা হয়। ২০২৫ সালে তিনি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার হন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা
২০২৪ সালের অক্টোবরে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০২৩ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা গ্রহণ করে। শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক আইজিপিকে আসামি করা হয়। তদন্ত সংস্থা পাঁচটি অভিযোগ এনে প্রতিবেদন দাখিল করে। ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এনএইচ