রাশিয়ার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোঁরায় চাকরির প্রলোভন। কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও লোভনীয় বেতন। ওভারটাইমসহ বাংলাদেশি টাকায় ৬০ হাজার টাকা বেতন। চুক্তিনামার সঙ্গে ভিসা ও উড়োজাহাজের টিকিট প্রদর্শন। ফ্লাইটও কনফার্ম। বাকি থাকলো ওড়ার পালা। এভাবে অনেকের কাছ থেকে নেওয়া হলো চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা করে। সর্বমোট ১৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা গত ৩ জুন শুক্রবার দুপুরে ফ্লাইট। তার আগের দিন সকলকে নিয়ে বিদায় সংর্বধনার আয়োজন! সেখানে সকলকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানোর কথা। সেই সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজন।
প্রিয় স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সবাই ছুটে গেলেন সেই কার্যালয়ে “মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টার”। গিয়ে দেখলেন, সেখানে কেউ নেই, তালা ঝুলছে! বিস্ময় আর হতাশায় চোখ কচলালেন অনেকে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, ভিসা জাল, উড়োজাহাজের টিকিটও ভুয়া।
আর এ খবরটি পেয়ে মাথায় হাত পড়লো প্রবাস গমনেচ্ছু অর্ধশতাধিক ভাগ্য বিড়ম্বনার স্বীকার মানুষের। আর এভাবে স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষদের কাছ থেকে ১৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা নিয়ে সস্ত্রীক উধাও খায়রুল হাসান (২৯)।
বাহারি ভিজিটিং কার্ডে প্রতারক খায়রুল হাসানের পরিচয়- তিনি এসএমএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা ও মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টারের প্রধান ক্যাশিয়ার। কথিত গ্রুপটির -'শ্লোগান ড্রিভেন ফর দ্য বেটার ফিউচার।'
সেই শ্লোগানই এখন অন্ধকার আর অনিশ্চয়তার পথে বসিয়েছে ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষগুলোকে। কথিত এ গ্রুপের অধীনে দেখানো কথিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টার, সেন্ট্রাল প্লাজা, আম্বরখানা, সিলেট। ও জে.জে.এন্টারপ্রাইজ।
খায়রুল হাসানের প্রতারণায় এভাবেই পথে বসেছেন তাঁর বন্ধুসহ বিভিন্ন এলাকার নিরীহ বিদেশ গমনেচ্ছু যুবকেরা ও নিকটআত্মীয়দের অনেকে। তারা ওই প্রতারকের কার্যালয় থেকে গ্রামের বাড়ি কোথাও গিয়েও কোনো কূল কিনারা পাচ্ছেন না। খায়রুল হাসানের বিষয়ে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, যে ভোটার আইডি কার্ড ব্যবহার করে তিনি ব্যাংক হিসাব খুলেছিলেন, সেটিও দি প্রিমিয়ার ব্যাংক, সিটি ব্যাংক আম্বরখানা শাখা। কথিত খায়রুল হাসান মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টার ও জে.জে.এন্টারপ্রাইজ নিয়েই খুলে বসেছিলেন প্রতারণার ব্যবসা।
আম্বরখানা মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টারের মালিক ইমন বলেন, আমার ভাই চয়নসহ আরো ১৫-২০ বন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন দেশে-বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে প্রায় ২-৩ কোটি টাকা তুলে দিয়েছিলাম মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টারের প্রধান ক্যাশিয়ার ও জে.জে.এন্টারপ্রাইজের পরিচালক প্রতারক খায়রুল হাসানের হাতে। ভিজিটিং কার্ডে যার এতো বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তিনি আমাদের টাকা মেরে দেবেন, তা কল্পনাতেও ভাবিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইমন বলেন আরও বলেন, আমার পরিবার ধার-দেনা আর সুদে টাকা যোগাড় করেছিলো। এখন আমার ভাইসহ বন্ধুদের টাকা না ফেরত দিলে আমাদের আত্মহত্যা করতে হবে। আমার ভাই তানভির নেওয়াজ চয়ন কিছু দিনের জন্য ভারতে ব্যবসার কাজে গেলে এর ফাঁকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ১৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কথা ছিলো ফ্লাইটের দিনই সকালে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে দেবেন।
এভাবেই আমার ভাই চয়নসহ ১৫-২০ বন্ধুদের কাছ থেকে ১৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা ঢাকা দিয়েছেন ওই প্রতারক খায়রুল হাসান। জে.জে.এন্টারপ্রাইজের যার লাইসেন্স পর্যন্ত নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাশর এক বড় ব্যবসায়ী বলেন, আমার সামনের দোকান ভাড়া নিয়ে এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে খায়রুল হাসান মানুষের কোটি টাকা হাতিয়ে নেবেন- তা কখনোই ভাবনাতেও আনতে পারিনি। পরে বিষয়টি জানাজানি হবার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, যে মার্কেটের বড় ব্যবসায়ী বলে প্রতারক খায়রুল হাসান বড় বড় ধাপ্পা দিয়ে চলাফেরা করতো। সেটিও সঠিক নয়।
সেন্টাল প্লাজা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম বলেন, খায়রুল হাসান সন্ধানে প্রায়ই অচেনা অজানা লোকজন গ্রামের বা সিলেটের আসেন। তারা খোঁজ খবর করেন। অনেক এসে খায়রুল হাসানের ব্যবসা জে.জে.এন্টারপ্রাইজ দেখেই মূর্চ্ছা যান।
এ নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতারণার মামলা থাকায় গত ১-২ মাস ধরে জে.জে.এন্টারপ্রাইজ ও মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টারের সাটার বন্ধ পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধে আরও জাতীয়, স্থানীয় ও অনলাইন পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে ছবিসহ নিউজ ছাপা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন থানা, ফাঁড়িসহ আদালতের মাধ্যমে মামলা, সাধারণ ডায়েরির অনুর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাভারের এসএমপি মিডিয়া পুলিশ কমিশার রহমত উল্লাহ জানান ইমন আহমদ বাদী হয়ে প্রতারক খারয়ল হাসানের বিরুদ্ধে ১৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ১৬৬৮, তারিখ ২৫-০৬-২০১৬খ্রিঃ।
এসএমপি মিডিয়া পুলিশ কমিশনার রহমত উল্লাহ জানান, মোবাইল নেটওয়ার্ক ধরে তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রতারক খায়রুল হাসান বেশ কিছুদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা, সাধারণ ডায়েরি এমনকি গত কয়েকদিন আগে মৌ-মিতা বিজনেস সেন্টারের মালিক ইমন আহমদের মাকে টিলগর বাসায় একা পেয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পায়তারা করে। পরে আশপাশের বাসার ভাড়াটিয়া জড়ো হতে থাকে। পরে প্রতারক খায়রুল হাসান তার সঙ্গপাঙ্গকে নিয়ে পালিয়ে যায়।
এআইএস





