গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে নির্ধারিত খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন এবং লাইসেন্স গ্রহণের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসার ধরন ও পণ্যের শ্রেণিভেদে নিবন্ধন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, প্রিমিসেস লাইসেন্স এবং উৎপাদিত বা আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্যপণ্যের নিবন্ধনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ছোট দোকান থেকে বড় প্রতিষ্ঠান—আওতায় আসছে সবাই

নতুন নিয়মের আওতায় শুধু বড় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়, ছোট খাবারের দোকান ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ব্যবসাও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। রাস্তার পাশের অস্থায়ী খাবারের দোকান, পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজু বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধন নিতে হবে।

এ ছাড়া প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী, পাইকারি মুদি ব্যবসায়ী, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনাকারীদেরও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে। খাদ্য আমদানি, রপ্তানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত নির্ধারিত ব্যবসাগুলোও এ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।

বিশেষ খাদ্যপণ্যে লাগবে লাইসেন্স

প্রবিধানমালায় সাধারণ খাদ্য ব্যবসা এবং বিশেষ ধরনের খাদ্যপণ্যের ব্যবসার জন্য পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। নির্ধারিত কিছু শ্রেণির ক্ষেত্রে নিবন্ধন যথেষ্ট হলেও বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত, আমদানি ও বিপণনের জন্য লাইসেন্স নিতে হবে।

এই শ্রেণিতে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ অনুরূপ পণ্য। শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা বিশেষ পুষ্টির প্রয়োজন রয়েছে—এমন মানুষের জন্য তৈরি খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া জৈব খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ বা ফোর্টিফায়েড খাদ্য, বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, অভিনব খাদ্য এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বা রোগের ঝুঁকি কমানোর দাবি করা হয়—এমন পণ্যের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

আবেদন, ফি ও নবায়নের নিয়ম

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবিধানমালার তফশিল-১০-এ নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ নম্বর ফরম এবং নিবন্ধনের জন্য ৫.১ নম্বর ফরম ব্যবহার করতে হবে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হলে তা নবায়ন করতে হবে। প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধনের জন্য ফি লাগবে না বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষ খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য ফি ১০ হাজার টাকা। আর ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের নতুন লাইসেন্সের ফি ৬০ হাজার টাকা।

নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করলে শাস্তির বিধান

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব খাদ্য ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, সেগুলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে আবেদন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএ নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করার বিধানও রয়েছে। এর ফলে ভোক্তারা পণ্যের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য শনাক্ত করতে পারবেন এবং কোনো অভিযোগ থাকলে নম্বরটি উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবেন।

প্রথমে জেলা কার্যালয়ে, পরে অনলাইনে আবেদন

প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আবেদন করা যাবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক আবেদন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, নতুন প্রবিধানমালার ফলে খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও লাইসেন্স কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

এনএইচ