আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ প্রোগ্রামে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে আমন্ত্রণটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

সোমবার (১০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; বরং বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানের নামের আগে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। তাঁদের মতে, কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কিছুটা বিব্রতকর। কারণ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং একই সঙ্গে পদাধিকারবলে বিমসটেকের চেয়ারপারসন।

দিল্লির হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

এদিকে সোমবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভারতের কাছে উত্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদেরও দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদের বিষয়ে ভারত যেসব নথি চেয়েছিল, সেগুলো ইতোমধ্যে দেশটির কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের দ্রুত প্রত্যর্পণের জন্যও ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ইতিবাচক ও সহায়ক পরিবেশ তৈরির বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পদক্ষেপ ভারত নেবে না বলে হাইকমিশনার আশ্বস্ত করেছেন।

সীমান্ত হত্যা ও পুশইনসহ বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় আসে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এসব বিষয় মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হওয়ায় সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে এগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়নি।

৫ আগস্টের ঘটনাও আলোচনায়

বৈঠকে গত ৫ আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অসন্তোষ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে এবং ভারত বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে।

খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা কিংবা বিদ্বেষ ছড়াতে পারে—এমন কোনো কর্মকাণ্ড যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ প্রত্যাশা জানিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষ থেকে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন।

দুই দেশের সম্পর্ক কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

ব্রিকসের আমন্ত্রণ ঘিরে কূটনৈতিক আলোচনা

প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেবেন কি না, এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কূটনীতিক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্মেলনে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। সফরের সিদ্ধান্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হতো।

ভিভিআইপি সফরের প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে তাঁর জানা মতে কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন নিউইয়র্ক সফরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক যাওয়ার কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো ভারতের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তাঁদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আমন্ত্রণের মাধ্যমে ভারত কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম. শহীদুজ্জামান বলেন, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে সম্পর্কের মৌলিক বিষয়গুলোতে ভারতের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

হাইকমিশনার যা বললেন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার ভারতের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন তিনি।

ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে। জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও জোরদার করার উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু থাকা স্বাভাবিক। তবে নেতৃত্ব পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

ভারতীয় হাইকমিশনার আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। দুই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো—সম্পর্ক ভালো থাকুক। বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।