মুহূর্তের মধ্যে যেন বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। দেশের ভেতরে কী ঘটছে, কোথায় কী পরিস্থিতি, কারা নিরাপদে আছেন- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছিলেন বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা। অনেকেই দিনের পর দিন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাতেও নিয়মিত আপডেট পাওয়া যাচ্ছিল না।

সেই তথ্য-অবরোধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত চার বাংলাদেশি গবেষক নিজেদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, সাংবাদিকতার নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খবর সংগ্রহ করে তারা তা পৌঁছে দিতে থাকেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন গ্রুপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের সমর্থনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করে পাঠাতেন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

অনেকের কাছে তখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন তারা।

তবে জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এই চারজনের অবদানের কথা এখনো খুব কম মানুষই জানেন। কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও মেলেনি তাদের। অবশ্য স্বীকৃতির দাবি নিয়েও কখনো সামনে আসেননি তারা।

তাদের ভাষায়, সেই সময়ে স্বীকৃতি নয়, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই চারজন হলেন- মোহাম্মদ আলী, মো. সাজ্জাদ হোসেন, মো. রেজাউল হক (কৌশিক) ও সুমন আলী।

বর্তমানে তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে চারজনই বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন। বর্তমানে মোহাম্মদ আলী যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। অন্য তিনজন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত।

জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল সময়ে কীভাবে তারা একত্রিত হলেন, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং কী ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছিলেন -এসব নিয়ে কথা হয়েছে এই চার নীরব যোদ্ধার সঙ্গে।

‘দেশে থাকলে আমিও আন্দোলনে শরিক হতাম’

জুলাই আন্দোলনের শুরুতে একের পর এক সহিংসতা ও মৃত্যুর খবর যুক্তরাষ্ট্রে বসেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল মোহাম্মদ আলীকে।

তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের শুরুতে, বিশেষ করে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর চারদিক থেকে নিহত হওয়ার খবর আসতে থাকে। তখন আর মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকতে পারছিলাম না। ওই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো আন্দোলনের চিত্র বদলে যায়। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, দেশে-বিদেশে আন্দোলন বেগবান হয়।”

দেশে থাকলে তিনিও আন্দোলনে অংশ নিতেন বলে মনে করতেন মোহাম্মদ আলী। কিন্তু হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রে বসে দেশের জন্য কী করা যায় -সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় নতুন উদ্যোগ।

তিনি বলেন, “দেশে থাকলে আমিও আন্দোলনে শরিক হতাম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসে কীভাবে দেশের জন্য কিছু করা যায়, সেটাই ভাবছিলাম। ঠিক তখনই বাংলাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন মনে হলো, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য কিছু করা সম্ভব।”

সাংবাদিকতার সূত্রে আগে থেকেই মো. সাজ্জাদ হোসেন, রেজাউল হক কৌশিক ও সুমন আলীর সঙ্গে পরিচয় ছিল তার। চারজনকে নিয়ে খোলা হয় একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। শুরু হয় আলোচনা—কীভাবে দূরে থেকেও জুলাই বিপ্লবের পক্ষে ভূমিকা রাখা যায়।

মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমরা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে আলোচনা শুরু করি, জুলাই বিপ্লবে নিজেদের কীভাবে কাজে লাগানো যায়। সবাই একমত হওয়ার পর নিজেদের পেশাগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতাম। সেসব সংবাদ রিপোর্ট আকারে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছে দিতাম। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও পাঠাতাম। দিন-রাত পরিশ্রম করে আমরা সেই কাজ চালিয়ে গেছি।”

‘রক্তপাত বন্ধে জনমত গড়াই ছিল আমাদের লক্ষ্য’

দেশের পরিস্থিতি মো. সাজ্জাদ হোসেনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতার খবর তাকে শুধু উদ্বিগ্নই করেনি, কিছু করার তাগিদও তৈরি করেছিল।

তিনি বলেন, “দেশের সেই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে সুস্থ থাকা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। একটি ন্যায্য দাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো কোনো সভ্য রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। যারা নিহত হচ্ছিল, তারা আমাদেরই সন্তান, ভাই-বোন কিংবা প্রতিবেশী। তাই নানা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেশের জন্য কিছু করতে পারাটা সৌভাগ্যের বিষয় ছিল।”

সাজ্জাদ হোসেনের ভাষায়, তাদের কাজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশে চলমান সহিংসতা ও রক্তপাতের বিষয়ে দেশ-বিদেশে জনমত তৈরি করা।

তিনি বলেন, “আমাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির চেষ্টা করেছি, যাতে এই রক্তপাত বন্ধ হয়। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল, দেশের শিক্ষার্থী, শিশু ও সাধারণ মানুষ যেন এই সহিংসতা থেকে মুক্তি পায়।”

বিবেকের তাড়নায় সংবাদ সংগ্রহ

জুলাইয়ের কিছু দৃশ্য আজও তাড়িয়ে বেড়ায় রেজাউল হক কৌশিককে। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য কিংবা মুগ্ধের ‘পানি লাগবে, পানি’ বাক্য- এসব মুহূর্ত তাকে দূরে বসেও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার তাগিদ দিয়েছিল।

তিনি বলেন, “বিবেকের তাড়নায় আমি ওই সময় জুলাই বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছি। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি কিংবা ‘পানি লাগবে, পানি’- এই দৃশ্যগুলো যখন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, তখন মনে হয়েছিল, আমাকেও তাদের জন্য, বিপ্লবীদের জন্য কিছু করা দরকার।”

সাংবাদিকতার পুরোনো যোগাযোগই তখন হয়ে ওঠে তার প্রধান শক্তি। পরিচিতজন ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। এরপর রাত জেগে সেই তথ্য যাচাই ও সংবাদ তৈরি করে পাঠাতেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

রেজাউল হক কৌশিক বলেন, “আমি আমার পরিচিতজন ও সাংবাদিকদের ফোন করে সংবাদ সংগ্রহ করতাম। পরে রাত জেগে সেসব সংবাদ লিখে দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠাতাম।”

তাদের কাজের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ছিল না বলেও জানান তিনি।

“আমাদের মূল চাওয়া ছিল যেকোনোভাবেই এই শিশু ও তরুণদের বাঁচাতে হবে, দেশের নিরীহ মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে। দেশে যেন কখনো আর এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, এটাই আমাদের চাওয়া।”

‘বস্তুনিষ্ঠ তথ্যই পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম’

সুমন আলীর কাছে এই কাজ ছিল সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধ এবং দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ।

তিনি বলেন, “আমাদের কাজ কোনো সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। আমরা শুধু বস্তুনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের সমর্থনে যে আন্দোলন হচ্ছিল, সেগুলোর খবরও দেশের গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।”

তবে এই কাজ সহজ ছিল না। সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্য প্রচারের কারণে বিভিন্ন মহল থেকে হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল তাদের।

সুমন আলী বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল, দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, পাসপোর্ট বাতিল করা হবে। জুলাই বিপ্লব সফল না হলে হয়তো দেশে ফেরাই কঠিন হয়ে যেত। এমনকি আমাদের পরিবারের সদস্যরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তেন।”

তবু কাজ থামাননি তিনি।

তখন একটি খণ্ডকালীন (পার্টটাইম) চাকরি করতেন সুমন। কিন্তু দিনের চাকরি এবং রাতভর সংবাদ সংগ্রহ ও লেখার কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সংবাদ সংগ্রহের কাজকে অগ্রাধিকার দিতে চাকরিটিই ছেড়ে দেন।

তিনি বলেন, “আমি তখন একটি পার্টটাইম চাকরি করতাম। সারারাত সংবাদ সংগ্রহ ও বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোর কাজ করতে হতো। ফলে দিনের চাকরি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত চাকরিটাই ছেড়ে দিই, যাতে পুরো সময় এই কাজ করতে পারি।”

দেশের প্রতি নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার সব সময়ের চাওয়া দেশ ভালো থাকুক, দেশের মানুষ ভালো থাকুক। দেশের মানুষ ভালো থাকলেই আমার ভালো থাকা।”

ইতিহাসের অনুলিখিত অধ্যায়

জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে রাজপথের সাহসী মানুষদের কথা থাকবে। থাকবে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের গল্প। তবে ইতিহাসের আরেক প্রান্তে রয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যারা সামনে না থেকেও নিজেদের অবস্থান থেকে আন্দোলনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

মোহাম্মদ আলী, মো. সাজ্জাদ হোসেন, রেজাউল হক কৌশিক ও সুমন আলী ছিলেন তেমনই চারজন।

তারা ছিলেন না রাজপথে। কিন্তু তথ্য-অবরোধের সেই সময়ে দেশের খবর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে নিজেদের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত সময়কে কাজে লাগিয়েছেন।

স্বীকৃতির জন্য নয়, কোনো পদ বা পুরস্কারের প্রত্যাশায়ও নয়- দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায় থেকেই তারা কাজ করেছিলেন।

হয়তো ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম বড় অক্ষরে লেখা থাকবে না। হয়তো তাদের কাজ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হবে না। কিন্তু ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের অন্ধকার সময়ে তথ্যের আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য এই চারজনের অবদান জুলাই বিপ্লবের অনুলিখিত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

কারণ, কোনো আন্দোলনের ইতিহাস শুধু রাজপথে লেখা হয় না; কখনো কখনো তা লেখা হয় হাজার মাইল দূরে বসে, একটি ফোনকলের পর আরেকটি ফোনকল করে, রাত জেগে সংবাদ লিখে এবং সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টায়।

এনএইচ