কুষ্টিয়াসহ পাঁচ জেলায় গ্যাস সরবরাহের জন্য সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও বিভিন্ন জটিলতায় এখ পর্যন্ত গ্যাস সরবারহ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ না হাওয়ায় ক্ষুব্ধ এ অঞ্চলের মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সমৃদ্ধ করতে এবং শিল্পায়ন ত্বরাণ্বিত করতে এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের দাবি করে আসছেন। এই দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ২০০৬ সালে এ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শুরু করে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে গ্যাস সেক্টর ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট ফেজ-২ এর আওতায় কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ শুরু হয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থেকে ঝিনাইদহ-যশোর হয়ে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ। এডিবি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৫৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস নেটওয়ার্ক প্রকল্পটি ২০০৯ সালের ২২ ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প ব্যয় ৬শ’কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও ঝিনাইদহ এ পাঁচ জেলার জন্য এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, মালামাল ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্নসহ নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দেয়। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

সূত্র জানায়, খুলনার সাথে এই প্রকল্পের সংযোগের ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় বাধা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার কাছে হার্ডিঞ্জ ব্রীজ সংলগ্ন পদ্মা নদী। উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের সেতু বন্ধন তৈরি করেছে পদ্মানদীর উপর লালন শাহ ব্রিজ। কিন্তু ব্রিজটিতে গ্যাস লাইন স্থাপনের জন্য কোন প্রভিশন রাখা হয়নি। সে কারণে চরম বিপাকে পড়ে ভেড়ামারা-খুলনা গ্রাস প্রজেক্ট বাস্তবায়ন।

সংশ্লিষ্টরা তাই বাধ্য হয়ে পদ্মা নদীর তলদেশের ৭০ ফুট থেকে ১৬০ ফুট গভীর দিয়ে পাইপ লাইন বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই দুরূহ কাজটি পায় জার্মানীর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গ্রীলকেট নামের একটি কোম্পানী। প্রায় সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলারে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজটি শুরু করে অখ্যাত এই কোম্পানী। কিন্তু তারা পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে মাত্র ২ কিলোমিটার খনন করে ৩০ ইঞ্চি ডায়া পাইপ স্থাপন করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। কাজটি করতে না পেরে সব মালামাল নিয়ে চলে যায় ওই কোম্পানী।

বাংলাদেশ গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানী সুত্র জানায়, ১৯১২ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রীজ নির্মাণের সময় পদ্মা নদী নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রচুর পরিমাণ পাথর ফেলা হয়। পদ্মার দু’ধারে গাইড ব্যাংক ও নির্মাণ করা হয় পাথর দিয়েই। পাথর ভেদ করে পাইপ লাইন স্থাপন করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে ৭০ ফুট থেকে ১৬০ ফুট গভীর দিয়ে ৩০ ইঞ্চি ডায়া পাইপ স্থাপন করা হবে। দু’বার চেষ্টা করেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জামার্নীর গ্রীলকেট। এ জন্য তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু সব টাকাই এখন নদীতে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বর্তমানে পাঁচটি গোডাউনে সঞ্চালন পাইপ মজুদ রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন বিভিন্ন ব্যাসের ৮৪৫ কিলোমিটার সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হবে। গ্যাস বিতরণের জন্য পেট্রোবাংলার আওতায় সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিসিএল) নামে কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এ কোম্পানি কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও ঝিনাইদহ গ্যাস সরবরাহ করবে। তবে এ জেলাগুলোর শুধু সদর এলাকাতেই পাইপলাইন স্থাপন করা হবে।

সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক এসএম রেজাউল ইসলাম বলেন, পাঁচ জেলায় গ্যাস সরবরাহের কাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস আসবে।

তিনি জানান, ভেড়ামারা থেকে খুলনার আড়ংঘাটা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।

এমআইএস