তাজুল ইসলামনিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) পরিচয়ে গ্রেপ্তারের ১৩ মাস আগেই তাজুল ইসলামকে ফরিদপুরের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাজুলের পরিবারের সদস্যরা এ দাবি করে বলেছেন, তুলে নিয়ে যাওয়ার পর দুটি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু পুলিশ জিডি নেয়নি। এ বিষয়ে ওই সময় তিনটি পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ গত সপ্তাহে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) চট্টগ্রাম থেকে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের (হুজি-বি) সদস্য দাবি করে যে পাঁচ যুবককে গ্রেপ্তার করে, তাঁদের মধ্যে মাওলানা মো. তাজুল ইসলামও রয়েছেন।
৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম থেকে পাঁচজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তাজুল একজন। র্যাবের পরিচালক (গণমাধ্যম) কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান দাবি করেন, গ্রেপ্তার পাঁচ যুবক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) সঙ্গে জড়িত।
এদিকে তাজুলের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, তাজুল ইসলাম ওরফে সুমন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের নকুলহাটি গ্রামের প্রতিবন্ধী কৃষক রাজ্জাক মাতুব্বর (৮০) ও গৃহিণী খাদিজা বেগমের (৬৫) ছেলে। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। মানিকগঞ্জ সদরের মানিকগঞ্জ দারুল উলুম মাদ্রাসার মক্তবে শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন।
তাজুলের বড় ভাই বাহারুল আলম ওরফে বাচ্চু (৪৭) ঢাকার কদমতলা থানা এলাকার জামিয়া ইসলামিয়া ইব্রাহিম মিয়া মেরাজনগর মাদ্রাসার বাংলা বিষয়ের শিক্ষক। মেজ ভাই মাহাফুজুর রহমান ওরফে নান্নু (৪০) ইরাকে থাকতেন। দুই মাস ধরে তিনি গ্রামের বাড়িতে আছেন। ছোট ভাই জাকারিয়া পান্নু (৩০) সালথার নকুলহাটি বাজারে একটি মনিহারি সামগ্রী দোকানের মালিক। তিন বোন হাসিনা বেগম, নাসিমা বেগম ও আসিয়া বেগমের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁরা যাঁর যাঁর স্বামীর বাড়িতে থাকেন। তাজুল দুই বছর আগে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ময়েনদিয়া এলাকার নাহার বেগমকে বিয়ে করেন। এখন পর্যন্ত এ দম্পতির কোনো সন্তান নেই।
তাজুলের পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে কয়েকটি গাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য এসে তাজুলকে তুলে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মানিকগঞ্জ দারুল উলুম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ওবায়দুল্লাহ প্রথম আলোকে জানান, তাজুলকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর আর কোনো সন্ধান আমরা পাইনি। মানিকগঞ্জ থানায় এ ব্যাপারে জিডি করতে গেলেও জিডি নেয়নি থানা। এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপারের কথা হয়েছে। তিনি (পুলিশ সুপার) অনুমান করে জানিয়েছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো এক দলের সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে যেতে পারে।’
তাজুল ইসলামের বড় ভাই বাহারুল আলম জানান, তাজুল সালথা থানার নকুলহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর চাঁদপুর ও ঢাকার তাঁতিবাজার এলাকার দুটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ইবতেদায়ি পাস করার পরে কারিয়ানা (নুরানি) প্রশিক্ষণ নিয়ে মানিকগঞ্জের ওই মাদ্রাসায় চাকরি শুরু করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘গত বছর নভেম্বরে ওকে (তাজুল) তুলে নিয়ে যাওয়ার পর এ ব্যাপারে আমি মানিকগঞ্জ থানায় তিনবার গেছি। কিন্তু ওসি আমিনুর রহমান আমার জিডি নেননি। পরে জিডি করতে গেছি ফরিদপুরের সালথা থানায়। কিন্তু সেখানেও আমাদের জিডি নেওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত, যুগান্তর ও সালথার একটি স্থানীয় পত্রিকায় ছবিসহ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। কিন্তু তারপর গত এক বছরে আমরা তাঁর কোনো খবর পাইনি। অবশেষে ৮ ডিসেম্বর র্যাব জানায়, সে নাকি চট্টগ্রামের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ভাইকে ১৩ মাস আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন ধরে নিয়ে যায়। এত দিন পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো কেন? সে যদি অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার করা হোক।’
তাজুলের বাবা রাজ্জাক মাতুব্বর বলেন, ‘আমার ছেলে মানিকগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় ছিল। সে মাসে একবার বাড়ি আসত। ওখানে সে কী করেছে তা আমি জানি না। হুজি কী তা আমি জানি না, ওসব আমি বুঝিও না। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। ও যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে প্রচলিত আইনে তার বিচার করা হোক।’
একই কথা বললেন তাজুলের মা খাদিজা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এক বছর ধরে নিখোঁজ। সেদিন টিভিতে দেখলাম র্যাব তাকে ধরেছে। আমরা জানি না বর্তমানে ও কোথায় এবং কীভাবে আছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। আইনের মাধ্যমে হোক বা যেভাবেই হোক না কেন।’
এ ব্যাপারে ফরিদপুরের সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ডি এম বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাজুল ইসলামের বাড়ি সালথা থানায় হলেও ঘটনাটি ঘটেছে মানিকগঞ্জ থানা এলাকায়। এ জন্য তাজুলের পরিবারের সদস্যরা ওই সময় জিডি করতে এলে তাঁদের মানিকগঞ্জ সদর থানায় জিডি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
সূত্র: প্রথম আলো
জারিফ





