সম্প্রতি সারা দেশে জঙ্গি দমন অভিযানের নামে পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ডসহ আনসারবাহিনীর সদস্যরা। অভিযানের নামে শুরু হয় গণগ্রেফতার। তার সাথে চলে বাণিজ্যও। সবমিলে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকার শীর্ষে নাম লেখায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও ‘আমজনতা’।
সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির মুখে গোটা দেশে স্বল্প সময়ের নোটিশেই আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নামিয়ে দেয়া হয় মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে।
প্রথম দফায় চলতি মাসের ৬ জুন প্রথম প্রহরে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামে। তাদেরকে মাঠে নামিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশনা দিয়ে সপ্তাহব্যাপী অভিযানকে (৬-১৩ জুন) ‘বিশেষ অভিযান’ আখ্যা দিয়ে সেটি পরিচালনা করা হয়।
গত সোমবার সেই বিশেষ অভিযান শেষ হয়েছে। এই অভিযানে সারা দেশ থেকে ১১ হাজার ২শ ৮১ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত বলে দাবি পুলিশের ।
এ অভিযানকে ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। সেটিরও পরিসমাপ্তি ঘটছে আজ শুক্রবার। সপ্তাহব্যাপী (১০-১৭ জুন) অভিযানটির শুরু হয়েছিল গত শুক্রবার প্রথম প্রহরেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জঙ্গিবিরোধী এই অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ১৭৬ জন। গতকাল গ্রেফতার হয়েছিল ১০ জন।
পুলিশ সদর দফতরের হিসেবে, ৬ জুন থেকে শুরু হওয়া প্রথম দফার অভিযানে সারা দেশে গ্রেফতার হয়েছেন ১১ হাজার ২শ ৮১ জন। তার সাথে ১০ জুন শুরু হওয়া অভিযানের ৬ দিনে গ্রেফতারের সংখ্যা ১৭৬।
এ ছাড়া প্রথম দফার অভিযান ১৩ জুন শেষের পর থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে সারা দেশে ১৫শ মানুষ গ্রেফতার হচ্ছেন। সে হিসেবে গত ৬ জুন থেকে গতকাল ১৬ জুন পর্যন্ত ১০ দিনে গ্রেফতার হয়েছেন ১৫ হাজার ৯শ ৫৭ জন।
সূত্র মতে, আইনশৃংখলা বাহিনীর রুটিন কাজ হিসেবে সারা দেশেই প্রতিদিনই ছোট বড় অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। এই রুটিন অভিযানে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মানুষ গ্রেফতার হন।
সে হিসেবে প্রতিমাসে ৪৫ হাজারের কমবেশি মানুষ গ্রেফতার হচ্ছেন, যাদেরকে পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা বলে আসছেন,চিহ্নিত করে আসছেন অপরাধী হিসেবে। আর যখনই বিশেষ অভিযানের প্রয়োজন পড়ে তখন গ্রেফতারের সংখ্যাটা কয়েক হাজারের কোটায় দাঁড়ায়।
তখন সেটিকে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিকসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গণগ্রেফতার বলে অভিহিত করে সেটিকে আইনশৃংখলা বাহিনীর বাণিজ্য বলে অভিযোগ তোলেন।
এদিকে, পুলিশের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রথম দিনে জঙ্গি সন্দেহে ৩৭, দ্বিতীয় দিনে ৪৮, তৃতীয় দিনে ৩৪, চতুর্থ দিনে ২৬, পঞ্চম দিনে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
১০ জুন থেকে সারা দেশে পুলিশের যে বিশেষ ধরপাকড় অভিযান চলছে, আগের দিন ৯ জুন পুলিশের সদর দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে সেটাকে ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।
পরদিন থেকে অভিযানের ফলাফল জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যে দৈনিক বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হচ্ছিল, তার শিরোনামেও লেখা ছিল ‘জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান’।
কিন্তু বুধবার থেকে হঠাৎই পুলিশ বলছে, চলতি সপ্তাহে শুধু ‘জঙ্গিবাদবিরোধী বিশেষ অভিযান’ নয়, আসলে একসঙ্গে দুটি বিশেষ অভিযান চলেছে।
অন্য বিশেষ অভিযানটি চালানো হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের জন্য। এ কারণে জঙ্গিদের পাশাপাশি অন্যান্য মামলার আসামীও বিপুল সংখ্যায় ধরা পড়ছে।
গত শুক্রবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে ১১ হাজার ৬৪৭ জনকে গ্রেফতারের কথা জানায় পুলিশ। তাদের মধ্যে ১৪৫ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি বলে জানানো হয়। এই ক'দিন সারা দেশে জঙ্গিদের পাশাপাশি অন্য আসামীদের গ্রেফতারের তথ্যও জানানো হচ্ছিল।
তবে সারা দেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে গণধরপাকড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বাহিনীটি। প্রশ্ন ওঠে জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযানের সাফল্য নিয়েও।
এরপর হঠাৎ করেই বুধবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো দৈনিক বিজ্ঞপ্তিতে বদল আনা হয়। ওই দিনের বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশের মোট গ্রেফতারের তথ্য বাদ দিয়ে শুধু ২১ সন্দেহভাজন জঙ্গি গ্রেফতারের খবর জানানো হয়। গতকাল এ সংখ্যা ছিল ১০।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির শেষে আরও জানানো হয়, গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসংক্রান্ত সপ্তাহব্যাপী (৬-১৩ জুন) বিশেষ অভিযান গত সোমবার শেষ হয়েছে।
জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সঙ্গে হঠাৎ নতুন অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের সিনিয়র তথ্য অফিসার এ কে এম কামরুল আহসান বলেন, গত সপ্তাহে আসলে একসঙ্গে দুটি বিশেষ অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।
এর মধ্যে ৬ থেকে ১৩ জুন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার-বিষয়ক অভিযান চলে। ওই অভিযানের মধ্যেই ১০ জুন থেকে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী জঙ্গিবাদবিরোধী বিশেষ অভিযান। দুটি অভিযান একসঙ্গে চলায় অনেকের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল।
তবে পরোয়ানা তামিলের অভিযান শেষ হওয়ার দাবি করে ওই অভিযানে মোট ১১ হাজার ২শ ৮১ জন গ্রেফতারের হিসেব জানালেও অন্যান্য উদ্ধারের হিসাব জানায়নি পুলিশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুল আহসান বলেন, কেউ চাইলে অভিযানের আটক-গ্রেফতারের পরিসংখ্যান দেয়া হবে।
জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে কিনা সে ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পুলিশ সদর দফতর।
পুলিশ বলছে, জঙ্গিরা যেন কোনওভাবেই সংগঠিত হতে না পারে সেজন্য পুলিশের তৎপরতা সব সময় থাকবে।
পুলিশ সদর দফতরের একজন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিশেষ অভিযানের সময় বৃদ্ধির বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। সাতদিনই অভিযান চলবে। এর বেশি নয়। তবে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলমান থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অভিযানে পুলিশ সদর দফতর সন্তুষ্ট। অনেক উগ্রবাদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এই সন্তুষ্টি নিয়ে আমরা বসে থাকতে চাই না। জঙ্গিবিরোধী অভিযান সবসময় অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে পুলিশের অভিযানে অনেক নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ আসছিল।
বিএনপি ও জামায়াত থেকেও অভিযোগ করা হয়েছিল, তাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। রমজানের এই মাসে নেতাকর্মীরা বাড়ী-ঘর ছাড়া মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছে।
এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানও এ অভিযান নিয়ে পুলিশের সমালোচনা করেন। অবশ্য তার সমালোচনার জবাবে পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেন, তিনি কিছ্ না বুঝেই কথা বলেন।
এসএম





