শ্রাবনের উড়ন্ত বৃষ্টির দূরন্ত ছোঁয়ায় তুমি কেমন আছো, সেটা জানতে চাওয়াটা বাতুলতা ছাড়া আর কি হতে পারে ?
যেদিন থেকে তোমার সকাল-সন্ধ্যা, পছন্দ-ভালোলাগা তথা গোটা চাওয়া-পাওয়া আমার জীবনের চাওয়া-পাওয়ার জড়িয়ে গিয়েছিলো, সেদিন থেকে একজনের ভালো থাকার সাথে যে এমন চমৎকারভাবে অন্যজনের ভালো থাকা নির্ভর করছে, তা ভেবে আজও পুলক অনুভব করি ।
হৃদয়ে ভালোবাসা দোলা পাই । আমার মন ভালো নাই জেনে তুমি কখনো হেসেছো, এমন কথা আমাদের চিরশত্রুও বলতে পারবে না । আমার মনের সাথে তোমার মনটা যে এমন মায়ায় বাধা পড়বে সেটা আমি পূর্ব থেকেই জানতাম ।
দু’জনের কিছুটা ত্যাগ, কিছুটা বিশ্বাস আর কিছুটা খুনসুঁটি থাকলে সেখানে ভালোবাসা পূর্ণতা না পেয়ে পারেই না । তোমার সাথে আমার যে আত্মার বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে সেটার শুরু তোমাকে প্রথম দর্শনের দিন থেকে । তখন তো তুমি আমার কেউ ছিলে না ।
একটা ছিপছিপে বিশ বসন্ত পেড়ুনো মেয়ে । কি দূরন্ত-চঞ্চল ! ঘর ভরা লোকের মাঝে আমাকে দেখেই ফিক করে হেসে দিয়েছিলে ।
পরে তুমিও বহুবার বলেছো, আমাকে না পেলে হয়ত জীবনের গল্পটা অন্য নীল রঙের কালি দিয়ে লিখতে হতো । জানো, কাকতালীয়ভাবে হলেও আমার মনে হয়, তোমাকে না পেলে আমার জীবনেও অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হত । সেই শুণ্যতার অনুভব কেমন হত সেটা উপলব্ধির ক্ষমতা দু’জনার কারো নাই বটে কিন্তু তোমার উপস্থিতিতে সকল অপূর্ণতা আজ পূর্ণতায় রূপ পেয়েছে ।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড তোমার শুণ্যতা আমাকে ব্যাকুল করে । ভালোবাসতে বাসতে বুড়োকালে পদার্পন করার পরেও আজও মনে হচ্ছে ভালোবাসার যেন শেষ নাই, সীমা নাই । আরও অজস্র বছর ভালোবাসলেও নিশ্চিত বলতে পারি, এখানে ভাটির টান লাগবে না । তোমার সাথে যত দিন কেটেছে, মনে হয়েছে গত দিনের চেয়ে বর্তমান দিন তোমাকে কিছুটা বেশিই ভালোবাসি, আরও আপন করেই চাই । তোমার কাছে জিজ্ঞাসা না করেই বলতে পারি, তুমি আমাকে এমন করেই চাও ।
জানো প্রিয় বিবি, জীবনের পড়ন্ত বেলায় তোমার আমার ভালোবাসা যখন আকাশের মত উদার এবং সাগরের মত গভীরতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়টাতে আমাদের উত্তরসূরী তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার মড়কে পুড়ছে । ওদের সামনে যেন ধূসর মরুভূমি দাঁড়িয়ে । ওদের সম্পর্কগুলো টিকছে না । গড়ে তুলতে যতদিন লাগছে, ভেঙ্গে যাচ্ছে তার চেয়ে বহুগুন দ্রুত গতি নিয়ে । কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না । কথা দিয়ে কথা রাখছে না । ভোগের উম্মত্ততায় সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ওরা ।
বলোতো, যে সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয় ভোগকে কেন্দ্র করে, সে সম্পর্ক কতক্ষণ টিকবে ? ভালোবাসার সীমা না থাকলেও ভোগের তো সমাপ্তি আছে । প্রয়োজন শেষ তো সম্পর্কও শেষ । একজন আরেকজন বিদায় বলতে, বছরের পর বছরের বিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে তোলা সম্পর্কের ইতি টেনে দিতে ওদের একটুও কষ্ট হচ্ছে না, বিবেক বাধা দিচ্ছে না ।
আজ-কালকার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেম খুঁজলে, তুমি নিশ্চিত নিরাশ হবে । উপপত্নী-উপপতি, শাখাপতি-শাখাপন্তি আজ ঘরে ঘরে । যার কারনে আসল পতি-পত্নির মনের খোঁজ হয়ত অনেক কাছে একেবারেই নাই । এটাই ওদের ভালোবাসার সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়েছে ।
বেডরুমে থেকে বাথরুমে শুধু ঝগড়ার স্বর, মান-অভিমানকে প্রধান্য দিয়ে এরা নিয়ত স্থায়ীভাবে আলাদা হয়ে যাচ্ছে । পূর্বের স্বর্ণালী দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করেও এরা সল্প সময়ের তিক্ততাকে জয় করার সামান্যতম চেষ্টা দেখাচ্ছে না । চিরকালের জন্য একজন আরেকজনকে বিদায় বলার জন্য উদগ্রীব হলে অন্যজন আর বোঝাতে-থামাতে চেষ্টা করে না বরং সে কণ্ঠকে আরও উচ্চ করে টা টা বলে দেয় । তারা যেনো সমাজকে বুঝিয়ে দিতে চায়, আপদ বিদেয় হয়েছে ।
ভালোবাসার স্বর্গীয় শক্তির স্বাদ ওরাই পেলোই না । ওদের প্রয়োজন-চিন্তায় ছিলো ভোগ, প্রয়োজন মিটবার পর একজন আরেকজনকে দূরে ছুঁড়ে ফেলতে ভাবার প্রয়োজন কি ? একজন চেলে গেছে তো অন্য কেউ প্রবেশ করবে-এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করার পক্ষপাতী ওরা নয় । বলতে পারো, এ প্রজন্মের গন্তব্য কোথায়, সামাজিক স্থিতিশীলতা কিভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে ?
অন্তর প্রিয় ঝালবিবি, আমাদেরও টুকিটাকি ঝগড়া হয়েছে। হবেই না বা কেন ? এক জায়গায় যুগের পর যুগান্তর বাস করলে সামান্য বিরোধ, রুচির পার্থক্য হওয়াটা কি খুব বেশি অস্বাভাবিক ? যে ঝগড়ার কারনে কিঞ্চিৎ মান-অভিমান, একবেলা না খেয়ে থাকা, বিছানায় দু’জন দু’দিকে ফিরে কাটিয়ে দেয়া । ব্যাস ! এতুটুকুই তো । আমাদের মান-অভিমান পাড়া-প্রতিবেশী জানতে পারেনি কোনদিন । হয়ত তুমিই জানতে দাওনি । সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য একজনকে তো ত্যাগ করতেই হয় । যে একটু বেশি ত্যাগ করবে সেই তো মহান । হয়ত মহান হওয়ার জন্য আমরা দু’জনেই প্রতিযোগি ছিলাম ।
ভালোবাসায় বিশ্বাস-ভক্তি থাকতে হবে পুরোদস্তুর । যেটা আমাদের সময়ে আমাদের মধ্যে ছিল কিন্তু এই প্রজন্মের কাছে বিশ্বাস-আস্থা কর্পুরের মত উঁবে গেছে । ঝালবিবি ! ওদেরকে একটু জানিয়ে দিতে পারো, বিশ্বাস-ত্যাগ ছাড়া কোন ধরনের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়না ।
ওরা ভালোবাসাহীন একটি পৃথিবীর দিকে এগুচ্ছে অথচ ভালোবাসা ছাড়া সুস্থভাবে বাঁচা যায়না। ভালোবাসার চেয়ে ওরা ভোগকে প্রধাণ্য দিচ্ছে বেশি কিন্তু ভোগের আবেদন সাময়িক কিন্তু ভালোবাসার আবেদন যে চিরায়ত-চিরকালের সেটা ওদেরকে বুঝতে হবে। ভালোবাসাহীন হলে দেহটা হয়ত বেঁচে থাকে কিন্তু মনের সবটা জুড়ে পঁচন ধরে । যে পঁচনে গন্ধ বাহির হয়না বটে কিন্তু সমাজকে অস্থির করে তোলে। অশান্তির দাবানল বইয়ে দেয় ।
ইতি, তোমার অদম্য প্রেম ।





