তুরস্কের প্রাক্তন রাজধানী ইস্তাম্বুলে গতকাল (৭ আগস্ট) হয়ে গেল দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্ববৃহৎ সমাবেশ। প্রায় চল্লিশ ছুই ছুই তাপমাত্রা ও সূর্যের আলোয় আকাশের নীলাভ চেহারা যেমন রূপ নিয়েছিল শুভ্রতায়, তেমনি তুরস্কের সবুজ জমিনও যেন ধারণ করেছিল টুকটুকে লাল রং। হাতে লাল পতাকা, গায়ে লাল টি-শার্ট আর মাথায় লাল ক্যাপ। চারিদিকে শুধু লাল আর লাল। মারমারা সাগরের তীরে যেন আছড়ে পড়ছিল কেবল লাল পতাকার ঢেউ। এই লাল যেন তুর্কিদের বিজয় ও বিপ্লবের চিহ্ন। তাইতো সারা দিন ‘গক বেয়াজ জমিন কিরমিজি’ অর্থাৎ ‘সাদা আকাশ লাল জমিন’ হেডলাইনই শোভা পাচ্ছিল তুরস্কের মিডিয়াগুলোতে।
গণতন্ত্র ও শহীদ সমাবেশ নামে আয়োজিত সমাবেশটি ছিল তুরস্কের রাজনীতির ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সমাবেশ। শুধু জনতার সংখ্যা বিবেচনায় নয় বরং ১৫ জুলাই পরবর্তী চলমান ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতায় এবং দেশী-বিদেশী নানা সমীকরণের প্রেক্ষিতে এ সামবেশ অত্যন্ত তাৎপর্যবহুল বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকৃত উপস্থিতি সংখ্যা কত?
মারমারা সাগরের তীরে ইস্তাম্বুলের ‘ইয়েনীকাপি’র বিশাল মাঠে আয়োিজত এ সমাবেশের আগে ইস্তাম্বুলের মেয়র এক বক্তব্যে বলেছিলেন, তারা আশা করছেন ৩৫ লাখ লোকের সমাগম হবে এ সমাবেশে। কিন্তু সমাবেশের এক দিন আগে বলা হয়, চল্লিশ লক্ষ লোকের সমাগম হবে সমাবেশটিতে। প্রোগ্রামের দিন দুপুর ১.৩০ টা থেকে সমাবেশে গেটগুলো উন্মোক্ত করার কথা থাকলেও সকাল ৯.০০ টা থেকেই সাগরের ঢেউয়ের মত তেড়ে আসতে থাকে জনতার স্রোত। কর্তৃপক্ষ তাই বাধ্য হয়ে সকাল ১০.৩০টা থেকে খোলে দেন সবগুলো গেট। নিরবিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে একে একে মাঠে প্রবেশ করতে থাকে জনতা।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাঠ কানায় কানায় ভরপুর হয়ে উঠে। সমাবেশ শুরু করার আগেই মাঠ পেরিয়ে সাগরের কেনারায় আছড়ে পড়তে থাকে জনতার উত্থাল তরঙ্গ। এভাবে মাঠ পেরিয়ে আশেপাশের রাস্তা ঘাট সব পরিপূর্ণ হয়ে যায় গণতন্ত্রকামী জনতার পদচারণায়। তখন থেকে মিডয়াগুলো প্রচার করতে থাকে ৫ মিলিয়ন তথা ৫০ লক্ষ লোকের সমাগম হয়েছে সমাবেশে। তবে আন্তর্জাতিক মিডয়াগুলো নিউজ করেছে মিলিয়ন তথা দশ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে ইস্তাম্বুলে গনতন্ত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে।
উল্লেখ্য, যে ৭ই আগস্ট শুধু ইস্তাম্বুলের ইয়েনিকাপি’তেই সামবেশ হয়নি, বরং একই সাথে একযোগে তুরস্কের অন্য ৮০ টি শহরেও একই ব্যানারে সমাবেশ অুষ্ঠিত হয়েছে। অন্য সামবেশগুলোতে গড়ে এক লাখ করে উপস্থিতি হলেও মোট ৮০ লাখ লোকের সমাগম হয়েছে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। সে হিসেবে তুরস্কের এই গণতন্ত্র সমাবেশে একই সময়ে রাজপথে ছিল সর্ব মোট (৫০ লাখ + ৮০ লাখ) এক কোটি ত্রিশ লাখ জনতা।
এ বিষয়টির দিক ইঙ্গিত দিয়েই তুরস্কের প্রধান বিরোধীদলের ভাইস চেয়ারম্যান লেভেন্ট গক বলেন, যে ইউরোপ আমাদের ব্যাপারে নাক গলায়, সে ইউরোপের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে আমাদের সমাবেশের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশী।

রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনকারী সমাবেশ
তুরস্কের গতকালের সমাবেশ দেশটির রাজনীতির পেছনের সকল ইতিহাসকে কেবল ভঙ্গই করেনি বরং নানা বিবেচনায় তা ছিল নতুন ইতিহাস সৃষ্টিকারীও। এই প্রথম দেশের সরকারী দল ও বিরোধী দলগুলো একইসাথে একই মঞ্চে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। মুলত ১৫ই জুলাই বিদ্রোহের রাত থেকে রাজপথে অবস্থান নেয়া জনতা কবে নাগাদ ঘরে ফিরতে পারে, এমন প্রশ্ন ছিল সর্বত্র। ফলে এই সমাবেশের ঠিক একসপ্তাহ আগে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান বলেন, ৭ই আগষ্ট একটি বড় আকারের সমাবেশ করার মাধ্যমে আমরা ঘোষনা দেব, কবে শেষে হবে জনগণের গণতন্ত্র পাহারা দেয়ার এই কর্মসূচি।
তারপর সমাবেশের প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ে সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে সরকারী দলের পক্ষ থেকে একে একে দাওয়াত দেয়া হয় বিরোধীদলগুলোকে। প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির পক্ষ থেকে প্রথমে দলের থেকে একটি ডেলিগেশন পাঠিয়ে দেবার কথা বলা হলেও পরবর্তীতে স্বয়ং দলীয় প্রধান কিলিচদারউলো অংশগ্রহণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সমাবেশে বক্তব্যও রাখেন।
অন্যদিকে সংসদের চতুর্থ বৃহত্তম দল এমএইচপি’র প্রেসিডেন্ট দেভলেত বাহচেলিও উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। তৃতীয় বৃহত্তম দল এইচডিপি’কে দেশটির সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পিকেকে’র সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অন্যান্য প্রোগ্রামের মত এই সমাবেশেরও দাওয়াত দেয়া হয়নি। রাজনীতিবিদদের বাইরে উপস্থিত ছিলেন, দেশের বহুল আলোচিত ও বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের হাতে জিম্মি থাকা সেনা প্রধান হুলুসি আকারসহ বিমান, নৌ ও পুলিশ প্রধানরা। রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আয়োজিত কোন সমাবেশে নি:সন্দেহে এটাই ছিল তাদের প্রথম উপস্থিতি। উপস্থিত ছিলেন, দেশটির এগারতম রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুল ও সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ দাভতুগলোও।
এভাবে ‘তেক য়ুরেক’ তথা একই হৃদয়ের অধিকারী হয়ে দলীয় পতাকা ও দলীয় শ্লোগান বাদ দিয়ে ‘তেক ভাতান ও তেক বায়রাক’ তথা এক দেশ ও এক পতাকা হাতে নিয়ে শুধু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই গণতন্ত্রের বিজয় পালন করতে জাতি হিসেবে সবাই উপস্থিত হয়েছিলেন সেদিন মারমারা সাগরের তীরে। নিজেদেরে মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে সব বড় রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে একই দাবীতে একই মঞ্চে আসন গ্রহণ করে গণতন্ত্রের যে উন্নত নমুনা প্রদর্শন করেছেন বিশ্ববাসীর সামনে, তা তুরস্কের ইতিহাসে তো বটেই গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় রচনা করেছে।
তাইতো এমইএচপির সভাপতি বাহচেলি তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘আজ আমরা রাজনীতির এক নতুন পাতা উন্মোচন করলাম। আসুন এখান থেকে আগামীর রাজনীতির মানচিত্র আঁকি।’ কাজেই এ সমাবেশকে রাজনীতির গতি প্রকৃতি পরিবর্তনকারী ও ভবিষ্যত রাজনীতির নতুন মানচিত্র অংকনকারী হিসেবে দেখেছেন দেশের রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।

দেশীয় প্রেক্ষাপটে সমাবেশের তাৎপর্য
১৫ই জুলাইয়ের ব্যর্থ সেনা ক্যু পূর্ববর্তী ও পরবর্তী তুরস্ককে কোনভাবেই এক পাল্লায় মাপার সুযোগই নেই। ১৪ই জুলাই পর্যন্ত শান্তশিষ্ট তুর্কিদের অন্তরে যেন বিপ্লবের দাবাণল জ্বালিয়ে দিয়েছে ১৫ই জুলাইয়ের ঐ কালো রাতটি। মিউজিক প্রিয় তরুণরা কানের হেডফোন খোলে ফেলে আর সিরিয়াল প্রিয় নারীপুরুষরা টিভির রিমোট ছুড়ে ফেলে দিয়ে রাজপথে নেমে এসে রচনা করতে থাকে নতুন নতুন বিপ্লবী গান আর ফিল্ম।
ইসলাম প্রিয় জনতার অনেকেই জায়নামাজ আর তাসবীহ নিয়ে উপস্থিত হন মাঠে। হাতে কেবল একটি করে লাল সাদার পতাকা। রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের ভাষায়, ‘আমাদের জাতি, হাতে একটি মাত্র পতাকা দিয়েই ঘুরিয়ে দিয়েছে সেনাদের ট্যাংকের গতি। আর বুকের ঈমান ও দেশপ্রেম দিয়ে ব্যর্থ করে দিয়েছে শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্র।’ সত্যিই, গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া এ এক অনবদ্য ইতিহাস রচনা করেছে তুর্কি জাতি। গতকালের সমাবেশ ছিল সেই দাবানলের একটা উজ্জ্বল স্ফুলিঙ্গ মাত্র।
ঘটনার পর থেকে তুরস্কের জনগণের দাবির আলোকে এবং প্রয়োজনের তাগিদেই সরকার পাল্টা ব্যবস্থা নিতে থাকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। ক্যু’র সাথে জড়িত বলে ‘ফেতুল্লাহ গুলেন মোভমেন্ট’ নামের যে সংগঠনটিকে দোষারোপ করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে, তাদের শক্ত ভীত গাড়া রয়েছে দেশের প্রতিটি সেক্টরে। কাজেই সরকারও ঘোষনা দিয়ে তাদের সেই ভীত উপড়ে ফেলতে সিদ্ধ হস্তে একের একের পর এক পদক্ষেপ নিতে থাকে।
সেনাবাহিনীর জেনারেল, অফিসার, বিমান, নৌ, পুলিশ, বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কাউকেই বাদ দেয়া হয়নি গ্রেফতারের আওতা থেকে। এমতাবস্থায় বলা যায় যে, এ বিষয়গুলো সামাল দেয়া কিংবা হজম করা সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেই রাত্রে বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী ৯ জন জেনারেল ও ২১৬ জন সেনা অফিসার পলাতক রয়েছেন এখনও। নিখোঁজ রয়েছে ২টি বিমান ও ৪২টি হেলিকপ্টার।
একদিকে পিকেকে’র সন্ত্রাসীদের আক্রমণে প্রায় প্রতিদিন নিহত ও আহত হচ্ছে দেশটির সেনা ও পুলিশের সদস্যরা, অন্য দিকে নতুন করে যোগ হলো পালিয়ে যাওয়া এই জেনারেল ও সেনা অফিসারদের বিষয়টি। এমতাবস্থায় গুপ্তহত্যা ও গেরিলা হামলা বেড়ে যাবার এক মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দেশটি। তাছাড়া তারা যে কোন সময় এক হয়ে বিদেশী শক্তির সহায়তায় ও বেসামরিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করে আবারও সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেনা, এটা হলফ করে বলার মত সময় আসেনি এখনো।
মি. গুলেনের সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে দেশের পাবলিক সেক্টরগুলোতে গণহারে যে আটক, গ্রেফতার ও পাসপোর্ট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকেও যে কোন সময় আন্দোলনের পরোক্ষ হুমকিতে রয়েছে সরকার। যদিও বর্তমানে চলতে থাকা জরুরি অবস্থার মধ্যে তা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। অভ্যুত্থানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকা সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনীর প্রধানদের সমাবেশে উপস্থিত করে সরকার যেন তাদের বুঝিয়ে দিল, দেখে নাও তোমরা কাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সেদিন উদ্যোগী হয়েছিলে।
সব মিলিয়ে, ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো যে সরকারী দলের একার নয় বরং সকল রাজনৈতিক দলসহ সেনা-পুলিশ সবাই, এককথায় গোটা জাতি যে সরকারের সাথে রয়েছে তা প্রমাণ করা ছিল সাত জুলাইয়ের মহাসমাবেশের অন্যতম উদ্দেশ্য। তুরস্কের ইতিহাসে এর আগের ৪টি সেনা ক্যু ও হস্তক্ষেপ রক্তপাতহীন সফল হলেও এবারের সেনা ক্যু’তে ২৩৭ জনের প্রাণ ও ২১৯১ জনের রক্ত ঝরিয়েও সফল হতে পারেনি তারা।
এরদায়োনের ১৪ বছরে হাতে গড়া এ তরুণ প্রজন্ম ট্যাংকের নীচে ও বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়ে রুখে দিয়েছে গনতন্ত্রবিরোধী এ দেশী-বিদেশী অপতৎপরতা। ভবিষ্যতেও, জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোন সরকারকে এভাবে অবৈধভাবে ফেলে দিতে চাইলে তার প্রেক্ষিতে জাতির ভূমিকা কি হতে পারে, সংশ্লিষ্ট সকলকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দেশের ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভঙ্গকারী সর্ববৃহৎ এ সমাবেশটি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সমাবেশের গুরুত্ব
তুরস্কের গত ১৫ই জুলাইয়ের ব্যর্থ সেনা ক্যু’তে আন্তর্জাতিক এক পরাশক্তির লেজ দেখা যাওয়ার ফলে বর্তমান তুরস্কে যা হচ্ছে তার কোন কিছুই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারছে না। বিশেষ করে ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক সর্বদলীয় সমাবেশ তো তাদের নজর এড়িয়ে যাবার প্রশ্নই আসেনা। বরং সঙ্গত কারণেই আমেরিকা, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গোটা পশ্চিমা বিশ্বের সতর্ক দৃষ্টি ছিল ইস্তাম্বুলের দিকে।
অবাক করার বিষয় হলো, রাশিয়া ছাড়া এই পরাশক্তিগুলোর কেউই একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত ও জনপ্রিয় সরকারকে ফেলে দেয়ার অপচেষ্টাকে নিন্দা জানায়নি। তুরস্ক যে ন্যাটো’র দীর্ঘ দিনের সহযোগী, সেই ন্যাটো থেকেও আসেনি সামান্যতম কোন সমবেদনা। বরং বিদ্রোহ পরবর্তীতে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমালোচনা অব্যাহত রাখে তারা। এক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয় এ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে।
এ্যামনেষ্টি তো বিদ্রোহ ঘটনার তিনদিনের মাথায় তুরস্কে এসে হাজির। ঘটনার সাথে জড়িত সেনাদের প্রাথমিকভাবে যে মাঠে রাখা হয়, তারা তা পর্যবেক্ষণ করে। তাদের মনের মত কিছু ছবি ধারণ করে ছড়িয়ে দেয় সোসাল মিডিয়ায়। অভিযোগ তুলে ধর্ষণের মত গুরতর অপরাধের। অথচ তখন পর্যন্ত একজন মহিলা পাইলট ছাড়া অন্য কান নারীকে আটকই করা হয়নি। যদিও এ্যামনেস্টি’র এ ধরণের রিপোর্ট বিশ্ব মহলে হালে পানি পায়নি, তবুও পশ্চিমা শক্তি এগুলোকে পুঁজি করেই আইনের শাসন ও মানবিধকার রক্ষায় তুরস্ককে মনোযোগী হবার পরামর্শ দিতে থাকে।
সন্দেহ নেই, এগুলো ছিল তুরস্কের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টির পশ্চিমা কৌশলমাত্র। আর তা বুঝতে পেরেই তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান, গত ২৯শে জুলাই এক সামবেশে পশ্চিমা বিশ্বকে ‘নিজের চরকার তেল দিন’ বলে আহবান জানিয়েছিলেন। পশ্চিমারা ‘একটি শোক বানী দিলে সাথে নয়টা উপদেশ দেয়’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যারা ১৫ই জুলাই অভ্যুত্থান চেষ্টার পর তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকার ও জনণের পাশে না দাঁড়িয়ে বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের সাথে তুরস্কের ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক বজায় থাকলেও কোন বন্ধুত্ব থাকবেনা। পশ্চিমা বিশ্বের আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে, ‘এই বিদ্র্রোহকে কাজে লাগিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে আগাচ্ছেন এরদোয়ান । তিনি বিদ্রোহীদের দমনের নামে মিডিয়া ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করছেন । আর এসব ক্ষেত্রে এরদোয়ান সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাচ্ছে।’
অথচ ১৫ই জুলাইয়ের রাতে বিদ্রোহ ব্যর্থ করে দেয়া থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তুরস্ক সরকার সংসদীয় প্রধান বিরোধীদলসহ অন্যান্য দলের সাথে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই কাজ করে যাচ্ছে। জরুরী অবস্থা জারির বিধান সংসদে যুক্তিতর্কের পর এমপিদের ভোটেই পাশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই কালো রাত থেকে এখন পর্যন্ত রাজপথে থাকা জনগণের সাথে আছে সরকারীদলসহ অন্যান্য বিরোধীদলগুলো। প্রধান বিরোধীদল নিজস্ব ব্যানারে ইস্তাম্বুলে একটিমাত্র সমাবেশ করলেও, সরকারী দল কর্তৃক আয়োজিত অন্যান্য সমাবেশগুলোতে অংশগ্রহণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন নিয়মিত।
এদিকে ইস্তাম্বুলে আয়োজিত বিরোধী দলের সমাবেশে প্রথমবারের মত অংশগ্রহণ করে সরকারী দল। তাছাড়া রাষ্ট্রপতির আহবানে সাড়া দিয়ে প্রথমবার রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করেন বিরোধীদলীয় নেতা কিলিচদারউলো। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দফায় দফায় বিরোধীদলীয় নেতার বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়েছে তুরস্কের মিডিয়ায়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিরোধী দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে হাজির হন একদিন।
এই দৃশ্যগুলো তুরস্কের জন্য শুধু নতুনই নয়, তুরস্কের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল ও সুদুরপ্রসারী পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ই জুলাইয়ের ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক সমাবেশ যেন পশ্চিমা সমালোচকদের কাঁটা গায়ে লবন ছিটিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে। প্রায় ৫০ লক্ষ লোকের বিশাল এই গণতন্ত্র সমাবেশে সরকারী দলের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে, দলীয় পাতকা ও ব্যানার বিসর্জন দিয়ে, মাঠে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলগুলোর সভাপতিবৃন্দ। এরদোয়ানসহ প্রায় সব নেতার কণ্ঠেই ছিল জাতীয় ঐক্যের সুর।
তাদের বক্তব্য হলো ‘সজ ভাতানসা বিজ বিরিজ’ অর্থাৎ দেশের ব্যাপারে আমরা সবাই এক। অথবা ‘য়াতার, সজ ডেমোক্রাসিনিন’ মানে ‘যথেষ্ট হয়েছে, এখন সময় গণতন্ত্রের’। সন্দেহ নেই যে, পশ্চিমা বিশ্বকে তাদের একতা ও ঐক্যের শক্তির জানান দিতেই এ ধরণের প্ল্যাকার্ড বহন করছে জনগণ। দেশের ব্যাপারে, গণতন্ত্রের ব্যাপারে, পতাকা ও মাটির ব্যাপারে তারা যে এক ও অবিচ্ছিন্ন দেহের অধিকারী, তা যেন হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমা চক্রান্তকারী শক্তিগুলোকে।
একই সাথে সেই কালো রাতের বিদ্রোহীদের কালো থাবা থামিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সব কিছুই যে সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, এখানে যে একটি দল কিংবা একজন ব্যক্তির কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠার কোন প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে না; ইস্তাম্বুলের মিলিয়ন মিলিয়ন লোক যেন লাল পাতকা ও লাল টি-শার্ট গায়ে দিয়ে একই রং ধারণ করে গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে আরেকবার।
এরদোয়ানের শক্তি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি
তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরাদোয়ান গত ২৯শে জুলাই বলেছিলেন, ‘১৫ই জুলাই রাতে যদি বিদ্রোহীরা জয়ী হতে পারত, তাহলে ১৬ই জুলাইয়ের সুর্য হতো তুরস্কবাসীর জন্য অন্যরকম। তুরস্কবাসী এক নতুন তুরস্কের মখোমুখি হত, যার সাথে আজকের তরুন প্রজন্ম একবারেই অপরিচিত।’ সেই রাত্রে স্বয়ং রাষ্ট্রপতিকেও হত্যা করার পরিকল্পনায় হামলা করা হয়েছিল তার বাসভবন এবং ছুটি কাটাতে অবস্থান করা হোটেলটিতেও। কিন্তু সেখান থেকে তিনি যেভাবে ঘুরে দাঁড়ান, তা ছিল রীতিমত এক দু:সাহসিক ব্যাপার।
এ ধরণের সেনা ক্যু’তে সাধারণত রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীরা সবার আগে আত্মগোপনে চলে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্ত এরদোয়ানের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তার উল্টো। তিনি নিজের ও পরিবারের চিন্তা না করে ঝুঁকি নিয়ে স্বপরিবারে এসে হাজির হন বিদ্রোহীদের দখলে থাকা ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট এলাকায়। আসার আগে মোবাইল ফোনে এক স্কাইপ কলের মাধ্যমে জাতিকে আহবান জানান বিদ্রোহ রুখে দিতে রাজপথে নামতে। টেলিভিশনে সেই আহবান ছড়িয়ে পড়ার পর লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রাজপথে। তারপর যা হয় সেটাতো এক অনবদ্য ইতিহাস।
বিদ্রোহ দমনে এরদোয়ানের এমন সাহসী আহবান ও নিজে ময়দানে এসে হাজির হওয়া, তুরস্কের জনগণের মাঝে চুম্বকের মত আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল। একই সাথে এই পদক্ষেপই অভ্যুত্থানপ্রয়াসী বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে চুরমার করে দেয়। অবশেষে অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হলে দেশবাসীর কাছে এরদোয়ানের জনপ্রিয়তার পারদ উর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুদের কাছে এরদোয়ানের প্রভাব ও শক্তির ভিত্তি স্ফুটিকের মত পরিস্কার হয়ে যায়।
তাছাড়া আগে থেকেই, নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সকল ক্ষেত্রে নারীদের অবাধ অংশগ্রহণে কোন বাধার সৃষ্ট না করা এবং পর্দানশীল নারীদের হিজাব পরে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ করার অনুমতি প্রদানের ফলে সব শ্রেনীর নারীদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা ছিল অনেক বেশী। কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি ২০২৩ সালের ভিশনকে সামনে নিয়ে আগামীর তুরস্ককে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তরুন প্রজন্মকে স্বপ্নচারী করে গড়ে তুলে তাদের কাছে এক স্বপ্নপুরুষে পরিণত হন এরদোয়ান। তাইতো তিনি আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘বাবা’ ও বয়স্ক মহিলাদের কাছে ‘আমাদের সন্তান’ হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন সহজেই।
প্রায় প্রতিটি বক্তব্যেই পশ্চিমা শক্তিকে এক হাত নিয়ে কথা বলা এবং এত কিছুর পরেও দেশের অর্থনীতি কলাপ্স না করার ফলে চানাক্কাল ও ইস্তাম্বুল বিজয়ী বীর তুর্কি জাতির কাছে এক যাদুকরী চরিত্র ও সাহসের সুউচ্চ মিনারের নাম রেজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান । তাইতো তারা আজ এরদায়ানকে ‘রাইস’ (নেতা) ও ‘বাশকমুতান’ (প্রধান কমান্ডার) সম্বোধনের পাশাপাশি ‘রাইস ভার য়েইস য়োক’ তথা ‘নেতা থাকতে হতাশ নেই’ এমন শ্লোগান বুকে ধারণ করে তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখছে নতুন ও উন্নত এক তুরস্কের।
এরদোয়ানের আহবানে সাড়া দিয়ে টানা ২৩ দিন রাজপথকে বিছানা বানিয়ে গণতন্ত্রের পাহারা দেয়া, আরেকটু বিশেষভাবে বললে তুর্কি জাতির সিংহপুরুষ এরদোয়ানকেই যেন নির্ঘুম পাহারা দিয়েছেন তারা। ১৫ই জুলাই বিদ্রোহ সফল হলে ১৬ই জুলাই থেকে এরদোয়ান নামে কেউ তাদের বাশকমুতান হিসেবে থাকবেনা, এটা বিশ্বাস করা ছিল তুরস্কের বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক অসাধ্য ব্যাপার।
এরদোয়ানকে হত্যা চেষ্টার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে রাজপথে অবস্থানকারী একাধিক বয়স্ক মহিলা, ইসলামপ্রিয় মানুষ ও তরুনকে দেখেছি ঝরঝর করে চোখের পানি ফেলতে। সর্বোপরি মাত্র এক সপ্তাহের ঘোষনায় ইস্তাম্বুলের মারামারা সাগরের তীরে ইয়েনিকাপি ময়দানে প্রায় ৫০ লক্ষ লোকের বিশাল সমাগম, তুরস্কের মাটিতে এরদোয়ান নামক মানব বৃক্ষের শিকড় যে কত গভীরে প্রোথিত রয়েছে, তার এক উজ্জ্বর প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।

নতুন তুরস্কের হাতছানি
সাতই জুলাইয়ের সমাবেশে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রেজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান আবারও বলেছেন, “১৫ই জুলাই রাত আমাদের জন্য একটি ‘টার্ণিং পয়েন্ট’ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। এখন থেকে আমরা তার ভাষায় ‘বির অলাজায, বিরি অলাজায, দিরি অলাজায, হেপ বিরলিক্তে তুর্ক অলাজায’। অর্থাৎ আমরা ঐক্যবদ্ধ হব, একক হব, জাগ্রত হব, সবাই মিলে তুর্কি হব।” এ থেকে স্পষ্ট যে ব্যক্তিগত ও দলগত সব ভেদাভেদ ভুলে এক জাতি হিসেবে এক পতাকাতলে আশ্রয় গ্রহণ করে একসাথে সামনে এগুনোর আহবান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান।
তিনি আরও বলেছেন যে, “আমরা যদি ১৫ই জুলাইয়ের রাতের মত এক থাকতে পারি, তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তি আমাদের পরাজিত করতে পারবেনা। আমাদের বুকে আছে ঈমান, হাতে আছে পতাকা আর সাথে আছে বিশ্বব্যাপী মজলুমদের দোয়া।” ঈমানী শক্তি, দেশপ্রেম আর একতার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এক নতুন তুরস্ক গড়তে চান এরদোয়ান। ২৯শে জুলাইয়ের সমাবেশে এরদোয়ান বলেছিলেন, “এক নতুন সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে তুরস্কের সামনে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচুর কাজ করে যেতে হবে।”
সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে জাতি একদিন তাদের কলার চেপে ধরবে বলেও হুশিয়ার করে দেন সবাইকে। বিদ্রোহের রাতে হত্যার শিকার হওয়া থেকে বেঁচে গিয়ে এরদোয়ান নিজে যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন পাকা খেলোয়াড়ের মত, ঠিক তেমনি ঘুরিয়ে দিতে চান এ জাতির ভবিষ্যতকেও। আর সে লক্ষ্যেই এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
এরদোয়ানের নিজস্ব ইচ্ছা ও ইসলামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল যে শক্তি, সে সেনাবাহিনী এখন তার হাতের মুঠোয়। ইতোমধ্যে সেনা প্রধানের কার্যালয়কে নিয়ে এসেছেন রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণে। আর সেনা সংক্রান্ত বাকী সব বিষয় হস্তান্তরিত হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের হাতে। ‘ইমাম হাতিপ স্কুল’ তথা টার্কিশ মাদ্রাসা থেকে গ্রাজুয়েটদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে সেনাবাহিনীর দ্বার। ভেঙ্গে দিয়েছেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা বৈষম্যের ব্যারিয়ার।
পাশাপাশি তিনি সংবিধানে থাকা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরেও আসছেন না। বরং ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে সুদীর্ঘকাল থেকে ইসলামপ্রিয় মানুষের সাথে যে জুলুম ও অবিচার করা হয়েছে তার শিকড় উপড়ে ফেলে দিত চান ধীরে ধীরে। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্র মানে হলো বৈষম্যহীন ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠা। আর ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হলো সবার ধর্ম পালন করা বা না করার অধিকার নিশ্চিত করা। এতে কেউ কাউকে চাপ কিংবা বাঁধা দিতে পারবে না।
আতাতুর্ক পরবর্তী তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে পশ্চিমা সংস্কৃতি আমদানি করে ইসলামকে যেভাবে নির্বাসনে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, সেখান থেকে ধীরে ধীরে তুর্কি জাতির মাঝে আবারও ইসলামী চেতনা জাগিয়ে তুলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় কাজ করে যাচ্ছেন এরদোয়ান। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তার সংঘাতের জায়গাটা এখানেই। তিনি একদিকে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে চলেছেন, অন্যদিকে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। যার ফলে বিদেশী পরাশক্তিরা কে কি বললো, এরদোয়ানের মত তার জাতিও আপাতত সে দিকে কান দিতে প্রস্তুত নয় মোটেই।
তুরস্কের গনতন্ত্রের সৌন্দর্যের রহস্যটাও এখানেই নিহীত রয়েছে। আমেরিকা কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুরস্কের রাজনীতির লাগাম ধীরে ধীরে ইসলামের দিকে ঘুরে যেতে দেখে নিজেদের মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হলেও, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশটির চলমান রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তন সাধন তাদের জন্য এক দু:সাধ্য ব্যাপার এখনো। সে জন্যই হয়তো (সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী) সেনা ও মি. গুলেনকে ব্যবহার করে পেছনের পথ দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল বার বার নির্বাচিত জনপ্রিয় এরদোয়ান সরকারকে। কিন্তু ততক্ষণে মারমারা, বসফরাস ও ব্ল্যাক সি’র পানি গড়িয়ে গেছে বহু দূর...।
এরদোয়ান তাই এখন, পশ্চিমা বিশ্বকে তুরস্কের জন্য বিশ্বাসঘাতক মনে করে আরেক বিশ্বপরাশক্তি রাশিয়ার সাথে পুরনো সম্পর্কের ক্ষতিগ্রস্ত দিকগুলো সংস্কার করতে উদ্যোগী হয়েছেন এবং আজ এমুহুর্তে রাশিয়ায় সফর করছেন। বিদ্রোহের রাত থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়া যেভাবে তাদের স্যাটেলাইটে ধারণ করা তথ্য দিয়ে তুরস্ককে সাহায্য করেছে, তাতে আপাতত প্রতিবেশী এই পরাশক্তিকে বন্ধু ভেবেই পাশে রেখে সামনে এগুতে চাচ্ছেন এরদোয়ান।
আর এ দৃশ্য দেখে সঙ্গত কারণেই বেজায় খুশি আরেক মুসলিম শক্তিধর রাষ্ট্র ইরানও । এমন পরিস্থিতিতে, ন্যাটো’র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া স্বত্তেও, ন্যাটো ও আমেরিকাকে পাশ কাটিয়ে কিভাবে, কোন পথে এগিয়ে যায় ১৫ই জুলাই পরবর্তী এরদোয়ানের নতুন তুরস্ক গড়ার প্রকল্প, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একইসাথে, পুরনো বন্ধু তুরস্কের এমন ইউটার্ণ আচরণের প্রেক্ষিতে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক জোট ন্যাটো’ই বা কি ভূমিকা নিবে, সেদিকেও রয়েছে বিশ্ববাসীর সজাগ দৃষ্টি।
(বি.দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)





