ইদানীং কালে টেলিভিশন ”টক শো” গুলোতে প্রায়ই শুনি দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ নাচ, গান, নাটক সিনেমা বাড়াতে হবে, বাংলা সংস্কৃতির ধারক বাহক বিভিন্ন দিবসকে উৎসব মুখর করতে হবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নৃশংস জঙ্গি হামলা রোধ কল্পে এই আয়োজন। অথচ সংস্কৃতি বলতে আমি বুঝি ” যাপিত জীবন”। মানুষের চিন্তা-ধারা, বিবেক, নীতি-নৈতিকতার সমন্বয়। আর নাচ, গান, নাটক, শিল্পকলার অংশবিশেষ।
সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার বলতে যেমনটি বুঝায় ঠিক তেমন একটি পরিবারে জন্ম হওয়ার সুবাদে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে আমাকে। বুঝি না বুঝি সেই কাঁক ডাকা ভোরে সুবেহ সাদেকের সময় নামাজ পড়ে সুর করে অন্তত এক পারা কুরআন পড়া আমার জন্য অবশ্যক ছিল। অসুখ ছাড়া কোনদিন সূর্যোদয়ে পরে বিছানা ছেড়েছি মনে পরে না। বংশ পরম্পরায় জেনেছি ধর্ম মানেই নিয়ামানুবর্তিতা, ডিসিপ্লিন, আদব- লেহাজ, দান এবং দয়া। ধর্ম আমার পরিচিতি, ধর্ম আমার অহংকার। মা, নানী, খালা সবাইকে সারাদিন দেখেছি শতকাজের মাঝেও ধর্মীয় বই নামাজ কোরআনের আলোকে জীবন চর্চা করতে। খুব ছোট বেলা থেকেই তাঁদের কাছে শিখেছি, ”সদা সত্য কথা বলিবে, কখনো মিথ্যা বলিবে না কারণ মিথ্যা বলা মহা পাপ”। আরও শিখেছি, ”জীবে দয়া করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর”।
বিয়ের পর দেখি আমার স্বামী ফকির (ধর্ম প্রচারক) বাড়ির সন্তান । তিনি মানুষদের সাহায্য করতে সিদ্ধ হস্ত ছিলেন। ভাবলাম ভালোইতো সাহায্য এবং সেবা ধর্মেরই অনুষঙ্গ। প্রতিদিন নিয়ম করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরি, রোজা রাখি, যাকাত এবং ফিতরা দেই। কারণ ধর্মে এসব কিছুই করার কথা বলা আছে। একবার পবিত্র হজ্ব পালন করারও সৌভাগ্যও হয়েছে আমার। ধর্মের প্রতিটি কাজ আমি যথা সম্ভব মনোযোগ দিয়ে আবেগ সহকারে পবিত্রতার সাথে সম্পন্ন করার চেষ্টা করি কারণ আমার মা’ আমাকে এমনটিই শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কোন প্রশ্ন নয় কেবলই বিশ্বাস কেবলই ঈমান। আল্লাহ্ দয়ালু, দানশীল, ক্ষমাশীল – যা কিছু চাইবার উনার কাছে চাও। এসবই আমার শিক্ষা, আমার যাপিত জীবন।
ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করার কোন অধিকার নেই কেবলই অন্ধ বিশ্বাস। অর্থ জানি না, মানে জানি না, উদ্দেশ্য জানি না তবুও আমি মুসলমান। অনেকে কারণ ছাড়া বলে ”আল্লাহ্ কে ভয় কর” যেন তিনি ভয়ঙ্কর কেউ। আমি মনে মনে ভাবি, ” যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা তিনি আমাদের প্রতি নিষ্ঠুর হবেন কি করে ” ? পরে নিজে নিজে বুঝে নেই কথাটা হয়ত এমন হবে, ”অন্যায় করার আগে ভাবো, মহান সৃষ্টিকর্তা অলক্ষ্য থেকে সবকিছু দেখছেন, তিনি অবশ্যই তোমার সঠিক বিচার করবেন ”। প্রতিদিন প্রতিকিছু আমি তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সঠিক ভাবে পালনের চেষ্টা করি।
এত সবকিছুর পরও যখন ২০১০ সালে টিংকুর ক্যান্সার ধরা পড়লো আমার বিশ্বাসে চির খেল। মন নিজের অজান্তেই কথা কয়ে উঠলো, ” কোথাও কিছু ভুল হয়নিতো ”! আবারও ওমরা করতে সৌদি আরব গেলাম। এবার আরবি পড়তে কষ্ট হচ্ছে। কারণ চোখের পানিতে আরবি হরফ ঝাপসা হচ্ছে বারংবার। তাঁর উপর সহি উচ্চারণ না হলে গুনাহর ভয়। এই অবস্থায় আমার মাথা কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো, রইল কেবলই আবেগ কেবলই হৃদয়। অতঃপর পরিপূর্ণ হৃদয়ে বাংলায় তওয়াফ শুরু করলাম। ছয় নাম্বার তওয়াফের সময় কথা গুলো এমন,”’ হে আল্লাহ্ আমার ভেতর বাহিরের সব কিছু তুমি জান, আমি যা জানি না তাও তুমি জান, আমার ভাগ্যে যা আছে অবশ্যই হবে, তুমি কেবল আমায় সইবার শক্তিটুকু দাও”। আর পড়তে পারার ক্ষমতা নেই। এবার কেবলই কান্না কেবলই অশ্রুজল।
সত্যিই তো মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলতে শব্দ লাগবে কেন! হৃদয় স্পন্দনই যথেষ্ট। অবশ্যই তিনি অন্তর্যামী আমাদের সব কথা জানেন এবং বুঝেন। সেই সাথে আমার আরও একটি কথা মনে হল, যেই ধর্ম এত সুন্দর করে মানুষের মনের কথা বলতে পারে সেই ধর্ম নিশ্চয়ই মানুষের সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও ক্ষমতা রাখে। সঠিক জ্ঞানের অভাবে অজ্ঞতার কারণে আমরা প্রশ্নকে মিছেই ভয় পাই।
কিছুদিন আগে ” পূর্ব-পশ্চিম ” এর অফিসে মিটিং এর অবসরে প্রখ্যাত সাংবাদিক পীর হাবিবুর রাহমান বলছিলেন, ” পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে অনেক শুভানুধ্যায়ী আপনজনেরা বলে থাকেন আমার জন্ম হয়েছিল ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে”। আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করলাম ঠিকই তো বলে,” আপনি তো ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন”।
ধর্মের উদ্দেশ্যই তো হচ্ছে সত্য প্রকাশে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করা । আমিও নিয়তই ভাবি , ”কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়”! আমাদের বিবেক, নীতি নৈতিকতাই তো ধর্ম। ধর্মীয় উগ্রবাদ অবশ্যই সমর্থন যোগ্য নয়। কিন্তু ধর্মের বিশালত্বের বিপরীতে নাচ, গান, নাটক কি করে হয় আমার মাথায় ঢুকে না।
ইদানীং কালে দেশে জঙ্গিবাদ উত্থানের সাথে সাথে আরেকটি শব্দ হর-হামেশাই উচ্চারিত হচ্ছে, ” নাস্তিকতা”! স্মার্ট ন্যাসের অংশ হিসেবে অনেকেই বলে থাকে, ” আমি নাস্তিক”। আমি জানার চেষ্টা করি নাস্তিক মানে কি ? উত্তর পাই ধর্মে বিশ্বাসী নয় কিন্তু মানবতাবাদী। আশ্চর্য হই, ভাবনায় পরি, ”ধর্মের মূল কথাই তো মানবতা ”। তবে ওরা নাস্তিক হয় কিভাবে?
লেখক: সাবেক পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্চ
এম এ





