বামপন্থীরা যখন ঐক্যের কথা বলেন তখন সেটিকে ‘সোনার পাথর বাটি’ মনে হয়। কারণ ওরা ঐক্যের ঝাণ্ডা উড়িয়েই ঐক্য বিন স্ট করে। সোভিয়েট কমিউনিস্টদের কোন এক নেতা বলেছেন,Red flag to oppose red flag. বামপন্থীরা রাজনীতি করে দুই স্ট্র্যাটেজিতে।
একটি হলো সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টি নাম করে। আরেকটি হলো অন্য কোন নাম ধারণ করে। বৃটিশ আমলের কথা বাদ দিলাম। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানে সরাসরি কমিউনিস্ট রাজনীতি করা সম্ভব ছিল না। তাই ওরা অনুপ্রবেশের পথ নেয়। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। ওরা সেই আওয়ামী মুসলিম লীগে ঢুকে পড়ে। পশ্চিম পাকিস্তানে ওরা সীমান্ত গান্ধী নামে পরিচিত লাল কোর্তা নেতা খান আবদুল গাফ্ফার খানের ঘাড়ে সওয়ার হয়।
এ ছাড়া সেখানে বিভিন্ন প্রদেশে তারা গউস বক্স বেজেঞ্জো, খয়ের বক্স মারি, জিএম সৈয়দ প্রমুখের ঘাড়ে সওয়ার হয়। তার পরেও তারা সেখানে কমিউনিজমের কোন ভিত গাড়তে পারেনি। খান আবদুল গাফ্ফার খানের মৃত্যুর পর তারা তার পুত্র ওয়ালি খানের ঘাড়ে সওয়ার হয়। অবিভক্ত পাকিস্তান যতদিন টিকে ছিল ততদিন বিভিন্ন ছদ্মনামে এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে অনুপ্রবেশ করে কোনমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখলেও পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অবশি স্ট পাকিস্তানে তাদের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে।
পাঞ্জাবে তাদের কোন দিনও কোন ফুট হোল্ড ছিল না। তাদের কিছুটা অস্তিত্ব ছিল সীমান্ত প্রদেশে এবং কিছুটা ছিটে ফোঁটা ছিল বেলুচিস্তানে। সিন্ধু প্রদেশে তাদের দু চারজন লোক ছিল। কিন্তু সিন্ধুতে জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্রবল উত্থান এবং পরবর্তীতে তার কন্যা বেনজির ভুট্টোর অসাধারণ জনপ্রিয়তার জোয়ারে সেখান থেকে কমিউনিস্টরা ভেসে যায়। সীমান্ত প্রদেশে কমিউনিস্টদের বিপরীতে ইসলামপন্থীদের উত্থান ঘটে। এখন এই প্রদেশটির নাম পাখতুন খাওয়া। এই প্রদেশে এখন ইমরান খানপন্থী সরকার রয়েছে এবং সেখানকার জনগণ ইসলামপন্থী। কমিউনিস্টরা সেখানে বিলীন হয়ে গেছে।
আসছি সাবেক পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে। আগেই বলেছি যে কমিউনিস্টরা প্রকাশ্য রাজনীতি করতে না পেরে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ে। পরে মধ্য পঞ্চাশ দশকে তারা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ গঠন করে। ন্যাপ গঠন উপলক্ষে টাঙ্গাইলের কাগমারিতে যে সম্মেলন হয় সেই সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে খান আবদুল গাফ্ফার খানসহ অনেক বামপন্থী নেতা এসেছিলেন। আরো ছিলেন ইয়ার মোহম্মদ খান। পূর্ব পাকিস্তানে ন্যাপের প্রধান হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
বিশ্ব রাজনীতিতে কমিউনিস্ট শিবির দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগের নেতৃত্ব দেয় সোভিয়েট ইউনিয়ন। আরেক ভাগের নেতৃত্ব দেয় গণচীন। তখন ন্যাপও দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগের প্রধান হিসেবে থাকেন মওলানা ভাসানী। আরেক ভাগের প্রধান হন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহম্মদ। মোজাফ্ফর আহম্মদ পরিচিত হন মস্কোপন্থী নামে আর মওলানা ভাসানী চীনপন্থী নামে। মোজাফ্ফর আহম্মেদের সাথে ছিলেন আজকের গণফোরামের পঙ্কজ ভট্টচার্য, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, বরিশালের মহিউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। আরো অনেকে ছিলেন যাদের নাম আজ আর মনে করতে পারছি না। আমি আজ যা কিছুই লিখছি সবই স্মৃতি থেকে। লেখার আগে সাধারণত আমি ইতিহাসের বই এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা পুস্তক ঘাঁটা ঘাঁটি করি। এ ছাড়া এখন তথ্য পাওয়ার আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। গুগল বা উইকিপিডিয়াতে অনুসন্ধান করলেই আপনি অনেক তথ্য পেতে পারেন। সময়ের অভাবে আমি ঐসব সাইট ভিজিট করতে পারিনি। আগেই বলেছি যে সব কিছুই স্মৃতি থেকে লিখছি।
ভাসানী ন্যাপে ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, মশিউর রহমানসহ আরো অনেকে। ন্যাপ রাজনীতির বিভক্তির ঢেউ তাদের ছাত্র ফ্রন্ট ছাত্র ইউনিয়নের ওপরও লাগে। বামপন্থীদের ছাত্র সংগঠনের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। ন্যাপ বিভক্ত হলে ছাত্র ইউনিয়নও বিভক্ত হয়। মোজাফ্ফর আহম্মেদ তথা মস্কোপন্থী ন্যাপের অনুগামী হয় ছাত্র ইউনিয়নের যে ফ্যাকশনটি সেটার নেতৃত্ব করেন মতিয়া চৌধুরী। মতিয়া চৌধুরীর পরে আওয়ামী লীগে জয়েন করেন এবং বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের কৃষি মন্ত্রী। তার সাথে তখন ছিলেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য (বর্তমানে গণফোরাম), সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক প্রমুখ। ভাসানীপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের অনুগামী হন কাজী জাফর আহমেদ। কাজী জাফর পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের অধীনে প্রধানমন্ত্রী হন। কাজী জাফরের সাথে ছিলেন রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ। মিস্টার রনো এখন সিপিবিতে। মেনন ও মতিয়াপন্থী ছাত্র ইউনিয়নে আরো অনেকে ছিলেন যাদের নাম আজ আর মনে করতে পারছি না। রাশেদ খান মেনন পরবর্তীতে ভাসানী ন্যাপ ছেড়ে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেন এবং নিজেই তার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। রাশেদ খান মেনন আজ শেখ হাসিনার অধীনে বিমানমন্ত্রী।
॥দুই॥
তবে বাংলাদেশে মূল ধারার কমিউনিস্ট পার্টি ছিল মনি সিং এর হাতে। তার সাথে ছিলেন খোকা রায় এবং অন্যেরা। বাংলাদেশে ১৯৭০ সালের দিকে মনি সিং কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু কমিউনিস্ট রাজনীতি অক্ষত অবস্থায় রয়ে যায় এবং সিপিবি বা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নাম ধারণ করে রাজনীতি করতে থাকে। ঐ দিকে ভাসানী ন্যাপের অবস্থা হয় ত্রিভঙ্গ মুরারি। কাজী জাফর আহমেদ এক সময় ভাসানী ন্যাপ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি বা ইউপিপি গঠন করেন। ন্যাপের আরেকটি অংশ রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে বেরিয়ে গিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেন। এখনো সেই নামেই চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাসানী ন্যাপ আরো অনেক ভাগে ভাগ হয়। এক সময় পাকিস্তান টাইমসের ঢাকা প্রতিনিধি সিরাজুল হোসেন খান গঠন করেন ‘জাগমুই’। তার আগে সাংবাদিকতা করা ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন নাম করা শ্রমিক নেতা। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর সমগ্র ভাসানী ন্যাপ যে কত ভাগে ভাগ হয়ে যায় তার খবর রাখা স্বয়ং সাংবাদিকদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। এখন দেশে ভাসানী ন্যাপ বিলুপ্ত প্রায়। জেবেল রহমান নামে একজন তরুণ নেতা এখন ভাসানী ন্যাপের সাইন বোর্ড টেনে বেড়াচ্ছেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সমগ্র রাজনীতি একটি নতুন বাঁক নেয়। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ দেশের প্রধান দুইটি বড় দলের মধ্যে অন্যতম দল। তাই কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগের ঢাল দিয়ে নিজেদেরকে আচ্ছাদিত রাখে। কিন্তু শেখ মুজিব ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের মত বিশাল রাজনৈতিক দলেও কম্পনের সৃষ্টি হয়। সকলেই জানেন, আওয়ামী লীগের ছাত্র ফ্রন্ট হলো ছাত্রলীগ। স্বাধীনতার ৬ মাস পরেই সেই ছাত্রলীগেও কম্পনের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান আমল থেকেই ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তিনি চ্যে গ্যুয়ে ভরা ও ফিডেল ক্যাস্ট্রোর লাইনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি কমিউনিস্টদের ঐ ডাকে সাড়া দেয়নি। স্বাধীনতার পর সিরাজুল আলম খান এবং তার অনুসারীরা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে যে ছাত্রলীগ গঠন করে সেই ছাত্রলীগ হয় সমাজতন্ত্রের অনুসারী। ছাত্র ফ্রন্টে বিভক্তির আগে সিরাজুল আলম খান এবং তার অনুসারীরা নতুন করে একটি দল গঠন করেন। এই দলটির নাম হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ। জাসদের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ। জাসদ যে সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দেয় তার নাম হয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র।
॥তিন॥
পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বামপন্থী আন্দোলন ভাঙ্গা গড়ার রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। জাসদ দেশের রাজনীতিতে প্রবল ঝড় তুললেও আওয়ামীপন্থী ছাত্রলীগে থাকার ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করায় ছাত্রলীগের অন্তত ৪/৫ জন নেতা দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এসব নেতা হলেন সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ। যারা জাসদ করেন তাদের মধ্যে ঐ সব নেতা ছাড়াও আরো যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শ্রমিক ফ্রন্টে মোহাম্মদ শাহজাহান, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, চৌধুরী খালেকুজ্জামান, আ ফ ম মাহবুবুল হক, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ।
ভাঙ্গনের পথ ধরে জাসদও দ্বিধা এবং ত্রিধা বিভক্ত হয়। চৌধুরী খালেকুজ্জামান, আ ফ ম মাহবুবুল হক এবং মাহমুদুর রহমান মান্না জাসদ থেকে বেরিয়ে একটি নতুন দল গঠন করেন। এই দলের নাম হয় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বা বাসদ। জিরাজুল আলম খান তখন জাসদেই থেকে যান। জাসদ ভেঙ্গে বাসদ হওয়ার পরেও যেটি জাসদ হিসেবে থেকে যায় সেখানেও ভাঙ্গন দেখা দেয়। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাসদের অংশটি ‘জেএসডি’ নামে পরিচিত হয়। অন্যদিকে জাসদের আরেক নেতা হাসানুল হক ইনু আরেক জাসদ গঠন করেন। এই জাসদের নাম হয় ইনুপন্থী জাসদ। এরা ছাড়াও কাজী আরিফ আহমেদ, শিরিন আকতার, শরীফ নুরুল আম্বিয়ারাও জাসদ করেন। কে যে কোন জাসদ করেন সেটি রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গবেষকদের পক্ষেও হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
॥চার॥
আজ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সর্বত্র কথা উঠেছে। সন্ত্রাস নিয়ে কথা উঠেছে। মনে হচ্ছে সবকিছু যেন ২০১৬ সালেই বা বড় জোর ২০১৩ সালে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি সন্ত্রাস তথা সশস্ত্র রাজনীতির গোড়ায় ফিরে যাই তাহলে দেখব সেখানে রয়েছে বামদল। অবশ্য যদি আমরা আরও পেছনে যাই তাহলে দেখা যাবে যে এদেশে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়। যে দলটি এই জঙ্গিবাদ চালু করে সেই দলটির নাম ছিল অনুশীলন দল। সেটি একটি বড় কাহিনী। সময় এবং সুযোগ হলে অনুশীলন দলের সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র কলাম লিখবো। বাংলাদেশে সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র তৎপরতা ৭০ দশকের প্রথমার্ধে দারুণ আলোড়ন তুলেছিল। তার শ্লোগান ছিল, “পিণ্ডি ছেড়েছি, দিল্লী যাব না।” ঐ দলের বক্তব্য ছিল এই যে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ (তার ভাষায় পূর্ব বাংলা) পিণ্ডির অর্থাৎ আজকের ইসলামাবাদের শৃঙ্খল মুক্ত হয়েছে। মুক্ত হওয়ার পর দিল্লীর কঠিন শৃঙ্খলেও আবদ্ধ হয়েছে। এখন দিল্লীর শৃঙ্খল ভাঙ্গার জন্য বাংলার জনগণকে সশস্ত্র লড়াই করতে হবে। বাংলাদেশে বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রথম ক্রস ফায়ার শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি পুলিশের ভাষায় এনকাউন্টারে মারা যান সিরাজ সিকদার।
বাংলাদেশে সংগঠিতভাবে সশস্ত্র তৎপরতা বা জঙ্গিবাদ শুরু করে বামদলের একটি শাখা।
আজ বামপন্থীরা যখন ঐক্যের কথা বলেন তখন সেটি কাঁঠালের আমসত্ত্ব হয়ে যায়। ওপরের এই আলোচনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
কলাম- লেখকের একান্ত নিজস্ব:





